ইতিহাসের পাতা থেকে মুছে ফেলা গল্প

লিখেছেন: আহনান সাফকোভিচ ||গল্পটা আব্দুল করিমের। আগ্রায় ইংরেজ অধীনস্থ সামান্য একজন কেরানি। কিন্তু তাঁর গল্পটি লিখতে হচ্ছে যার কারণে, তাঁর নাম শুনলেই কপালে উঠবে আপনার চোখ। স্বয়ং রাণী ভিক্টোরিয়া। জ্বী, একটুও ভুল শোনেননি। সামান্য এক কেরানির সাথে সখ্যতা গড়ে উঠল কিনা সারা বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর রাণী ভিক্টোরিয়ার সাথে। যাক, গল্পটা এবার খুলেই বলি।

সময়টা ১৮৮৭ সাল। সমগ্র ভারতের পক্ষ থেকে রাণী ভিক্টোরিয়ার স্বর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে তাঁর হাতে তুলে দেয়া হবে একখানা মোহর। মোহরটি রাণীর হাতে তুলে দিবে দু’জন ভারতীয় কর্মচারী। ডাক পড়ল আব্দুল করিম ও মুহাম্মদ বখশের। আমাদের গল্পের নায়ক আব্দুল করিম বেশ লম্বা আর সুদর্শন।

বলা রাখা ভাল, রাণী ভিক্টোরিয়ার বয়স তখন ৬৭। এমন এক সময়ে আব্দুল করিম আর আহমদ গেল রাণীর হাতে মোহরটি তুলে দিতে। তাদেরকে পরানো হলো ভারতীয় খান্দানী পোষাকাদি। রাণীর সাথে দেখা করার যাবতীয় আদব-কায়দা কর্মচারীরা ভালোভাবেই শিখিয়ে দিল। রাণীর চোখের দিকে তাকানো যাবে না, রাণীর কাছ থেকে পিছন দিক ফিরে আসা যাবে না ইত্যাদি। কিন্তু সব ঠিক রাখতে পারলেও একটা ভুল করেই ফেলল আব্দুল করিম। রাণীর চোখের দিকে তাকানোর লোভ সামলাতে পারল না৷

আব্দুল করিমের এ ধৃষ্টতায় রাজ কর্মচারীরা অস্থির হয়ে পড়ল। কিন্তু রাণী ভিক্টোরিয়ার মাঝে তেমন কোনো ভাবান্তর দেখা গেল না। উপরন্তু, তিনি তলব করলেন আব্দুল করিম। কোনো শাস্তি দেয়ার জন্য নয়। সবাইকে অবাক করে দিয়ে কিছুদিনের জন্য নিজের পথসঙ্গী হিসেবে তাকে থাকতে আদেশ করলেন। সেদিনের ঘটনা নিয়ে রাণী তাঁর ডায়েরিতে লিখেছিলেন, ” অন্যজন ( করিম) বেশ তরুণ, হালকা-পাতলা আর সুদর্শন। তারা উভয়ে আমার পায়ে চুমো খেয়েছে “।

রাণী ভিক্টোরিয়া যেন আব্দুল করিমের মাঝে এক নিষ্পাপ প্রতিচ্ছবি খুঁজে পেলেন। স্বামী আলবার্ট মারা গেছেন দীর্ঘদিন হলো। তারপর থেকেই তিনি একা। হতো তার চারপাশে ঘুরে বেড়ায় প্রধানমন্ত্রী, অভিজাত বংশের সন্তান, রাজকীয় কর্মচারী, কিন্তু সকলকেই তাঁর স্বার্থান্বেষী মনে হয়। ক্ষমতা আর প্রতিপত্তির লোভে সবাই অন্ধ। কিন্তু ভারতের অধিবাসী আব্দুল করিম যেন এর তাদের চেয়ে ভিন্ন। তাঁর সততা, চঞ্চলতা মুগ্ধ করে রাণী।

রাণী ভিক্টোরিয়া আব্দুল করিমকে নিজের সার্বক্ষণিক সঙ্গী করে নিলেন। তাঁর কাছে খুলে বলতে লাগলেন নিজের জমে থাকা কথাগুলো। বহুদিন পর এমন কাউকে পেলেন, যার কাছে প্রকাশ করা যায় মনের অনুভূতি। করিমও এদিকে কম যান না। রাণীকে বলল তাজমহল আর শাহজাহানের গল্প, দিল্লীর মোগলাই প্রাসাদ আর রাস্তাঘাটের আভিজাত্যের গল্প, আর কত কি! করিমের কাছে শুনে রাণী আম খাওয়ার আবদার করল। আবার ইচ্ছে হলো, তিনি উর্দু শিখবেন। আব্দুল করিমকে বানিয়ে নিলেন নতুন নিজের ব্যক্তিগত “মুন্সী”। রাণীর যেন নিজের যৌবনের আনন্দ আবার ফিরে পেলেন।

কিন্তু বুড়ো বয়সে এসে রাণীর এমন ছেলেমানুষি সহ্য হচ্ছিল না রাজবংশের সদস্য, কর্মচারীদের। ভারত থেকে আসা এক কেরানি কিনা দখল করে নিচ্ছে রাণীর প্রিয়পাত্রের স্থান। তারা একের পর এক বানানো অভিযোগে কান ভারী করতে লাগল রাণীর। কিন্তু এতোদিন পর পাওয়া মনের মতো নিঃস্বার্থ বন্ধুকে ছাড়তে চাইলেন না রাণী ভিক্টোরিয়া। শত মান-অভিমান সত্ত্বেও ধরে রাখলেন আব্দুল করিমকে। একেবারে মৃত্যুশয্যা পর্যন্ত।

১৯০১ সালে মারা যান রাণী ভিক্টোরিয়া। সিংহাসনে বসেন রাজা অষ্টম এডওয়ার্ড। করিমের প্রতি চেপে রাখা ক্ষোভ তখনো তার মনে। প্রথমেই আদেশ করলেন আব্দুল করিমের সাথে সংশ্লিষ্ট সবকিছু পুড়িয়ে ফেলতে। রাণীর উর্দু শিখার খাতা, করিমের উপহার দেয়া জিনিসপত্র, সবকিছু। অবশ্য রাজা এডওয়ার্ড এক বিশেষ দয়ার(!) কাজ করেন। করিমকে রাণীর শেষকৃত্যে অংশগ্রহণের অনুমতি দেন। ১৯০১ সালে করিমকে পাঠিয়ে দেয়া হয় ভারতে। ১৯০৯ সালে করিমও পরপারে পাড়ি জমায় রাণীর সাথে দেখা করতে। করিম হারিয়ে যায় ইতিহাসের পাতা থেকে।

এভাবে দীর্ঘকাল এ ইতিহাস চাপ পড়ে থাকে। সর্বপ্রথম ২০১০ সালে রাজ পরিবার বিষয়টিকে সকলের সামনে আনে। রাণীর সাথে করিমের ফটোগ্রাফও প্রকাশ করা হয়। আব্দুল করিমকে নিয়ে আঁকা রাজকীয় ছবিও সবার গোচরে আসে।

এ কাহিনীকে উপজীব্য করে নির্মিত হয়েছে ব্রিটিশ সিনেমা ” Victoria and Abdul”। হাতে সময় থাকলে ঘুরে আসতেন পারেন ১০০ বছর পুরোনো রানী ভিক্টোরিয়া আর কেরানি আব্দুল করিমের ইতিহাসখ্যাত বন্ধুত্বের চিত্রায়ণ থেকে।

Image may contain: 1 person, hat
রাজকীয় সংগ্রহে আব্দুল করিমের জলছবি।
Image may contain: 1 person, hat
রাণী ভিক্টোরিয়া ও আব্দুল করিম

Victoria and Abdul সিনেমার পোস্টার

আমরা সাহিত্য চর্চাও করবো না, লেখকও তৈরি করবো না, সম্পাদনাও করবো না, কেবল প্রকাশ করবো স্বপ্ন আর সৌহার্দ্য।

আপনার লেখা আজেই পাঠিয়ে দিন শুভ্র কাগজে। এই কাগজ প্রকাশ করবে আপনার প্রীতি।