Upolobdhi- Shuvro-kagoj

উপলব্ধি

লিখেছেন
এন. আর. নাহিদ

বাবা আমি গাড়ি চালানো শিখবো। খেতে বসে বাবার কাছে আবদার করল আরিফ। বাব হাসতে হাসতে বললেন হ্যা,
শিখবে শিখবে। অবশ্যই শিখবে। তবে আরেকটু বড় হয়ে নাও। আরিফ মুখ গোমড়া করে বলল না বাবা আমি কাল থেকেই
গাড়ি চালানো শিখবো। আরিফের বাবা হো হো করে হেসে বললেন, বলে কি পাগল ছেলে কাল থেকেই নাকি গাড়ি চালানো
শিখবে। আরিফ রাগান্বিত স্বরে বলল, বাবা আমি কোন মজা করছিনা। আমি সত্যিই কাল থেকে গাড়ি চালানো
শিখব।তুমি আমাকে শিখাবে। আরিফের বাবা এবার সিরিয়াস হলেন। বললেন, দেখো আরিফ তোমার বয়স মাত্র ষোলো।
তুমি এখনো ছোট্ট। তোমার এখনো গাড়ি চালাবার বয়স হয়নি। আর তুমি লাইসেন্সও পাবেনা এই বয়সে। 

  • আমার লাইসেন্স লাগবেনা। আমি তো শুধু গাড়ি চালানো শিখতে চাই। আমিতো আর গাড়ি নিয়ে ঘুরে বেড়াবনা।
  • গাড়ি চালানো শিখলেই তোমার মন চাইবে গাড়ি নিয়ে বের হতে। গাড়ি নিয়ে ঘুরতে। আর লাইসেন্স ছাড়া বের হলেই
    পুলিশ তোমাকে হাজতে ঢুকাবে। তার থেকে বড় কথা যেকোনো সময় যেকোনো অঘটন ঘটে যেতে পারে। তাই এই বয়সে
    আমি তোমাকে কখনই ড্রাইভিং শিখবার অনুমতি দিবনা। 
    আরিফ হুট করে খাবার রেখে উঠে গেলো। বাবা খাবার শেষ করার জন্য পেছন থেকে ডাক দিলো আরিফকে। কিন্তু
    আরিফ বাবার কথা না শুনে হনহন করে নিজের রুমে গিয়ে দরজা লাগিয়ে দিলো।
    আরিফের বাবা আজাদ সাহেব। শহরের নামকরা ব্যবসায়ীদের একজন। ছেলের সব আবদার সব সময় পূরণ করেছেন
    তিনি। কিন্তু এই আবদার পুরন করার মত না। মাত্র ষোলো বছর বয়স আরিফের। ড্রাইভিং শিখবার জন্য এটি মোটেও
    উপযুক্ত বয়স নয়। যেকোনো সময় যেকোনো অঘটন ঘটে যেতে পারে।
    আজাদ সাহেবের স্ত্রী আজাদ সাহেবকে বললেন, আরিফ এত করে যখন বলছে, শিখাওনা ইকে ড্রাইভিং। কি এমন
    আর হবে। তুমি সাথে সাথে থাকবে। কিছু হবেনা। ড্রাইভিং বা শিখালে কিছুই মুখে নিবেনা সে। তুমি তো চেনো তোমার
    ছেলেকে।
    আজাদ সাহেব গম্ভীর গলায় বললেন হুম ঠিকই বলেছো তুমি। 
    আজাদ সাহেব আরিফের রুমে যান। বালিশের নিচে মুখ লুকিয়ে শুয়ে আছে আরিফ। বাবা মার সাথে রাগ করলে রুমে এসে
    এভাবে শুয়ে থাকে সে। আজাদ সাহেব আরিফের মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন কাল থেকে আমি তোমাকে গাড়ি চালানো
    শিখাব। আরিফ লাফিয়ে উঠে বলল সত্যি বাবা! আজাদ সাহেব ঠোটে একটা হাসি এনে বললেন হ্যা সত্যি। চলো খাবার
    শেষ করে আসনি তুমি। খাবার খাবে আসো। আরিফ খুশি মনে বাবার সাথে রুম থেকে বেরিয়ে আসে।
    পরেরদিন সকালে আজাদ সাহেব আরিফকে নিয়ে গাড়িতে বসেন।আরিফ আজ ভীষণ উত্তেজিত। এতদিন সে গাড়ির
    পেছনের সিটে বসত। আজ সে বসেছে ড্রাইভিং সিটে। বাবা তাকে আজ গাড়ি চালানো শিখাবে। স্কুলে গিয়ে সবাইকে বুক
    ফুলিয়ে বলবে আমার বাবা আমাকে গাড়ি চালানো শিখিয়েছে। আমি এখন নিজেই গাড়ি চালাতে পারি। আরিফের কথা শুনে
    তমাল তখন হিংসুক মুখে তার দিকে তাকিয়ে থাকবে। ভাবতেই আনন্দ হয় আরিফের।
    আজাদ সাহেব আরিফকে শিখাতে শুরু করেন কিভাবে গাড়ি স্টার্ট করতে হয়। কিভাবে ধীরে ধীরে এক্সিলারেটরে চাপ
    দিতে হয়। কিভাবে গাড়ি ফার্স্ট গিয়ার, সেকেন্ড গিয়ারে নিতে হয়। কিভাবে গাড়ি পেছনে নিতে হয়। সব শেষে আজাদ
    সাহেব বললেন এখন আমি তোমাকে শিখাব কিভাবে হার্ডব্রেক করতে হয়। মনে রাখবে গাড়ি চালানোর ক্ষেত্রে
    হার্ডব্রেক খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যেকোনো সময় তোমার গাড়ির সামনে যেকোনো কিছু চলে আসতে পারে। তখন তোমাকে
    আচমকা ব্রেক করতে হতে পারে। অন্যথায় তোমার কিংবা গাড়ির ক্ষতি হয়ে যেতে পারে। তাই হার্ডব্রেক খুবই
    গুরুত্বপূর্ণ।
    আরিফ মন দিয়ে বাবার কথাগুলো শুনে।তারপর শিখে নেয় কিভাবে হার্ডব্রেক করতে হয়। এভাবে প্রতিদিন আরিফ
    বাবার কাছে ড্রাইভিং শিখতে থাকে। কিছুদিনের মধ্যেই আরিফ গাড়ি চালানো শিখে যায়। তারপর ভোরবেলা রাস্তা
    যখন ফাঁকা থাকে আরিফ তার বাবার সাথে গাড়ি নিয়ে বের হয়। আজাদ সাহেব স্টেয়ারিং ধরে থাকেন। ধীরে ধীরে গাড়ি
    চালায় আরিফ।
    একদিন রাতে আরিফ আবার জিদ করে। সে ব্যস্ত রাস্তায় গাড়ি চালাবে। ভোরবেলা এভাবে ধীরে ধীরে গাড়ি চালতে
    ভালো লাগেনা তার।তাছাড়া বাবা স্টেয়ারিং ধরে থাকে। নিজের মত করে চালাতেই পারেনা সে। আজাদ সাহেব কিছুতেই
    ছেলের এই জিদে রাজি হন না। কিন্তু ছেলের জিদের কাছে আবারো তাকে হার মানতে হয়।
    পরেরদিন আরিফ গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়ে ব্যস্ত রাস্তায়। আজাদ সাহেবওও আছেন আরিফের সাথে। বেশ ভালোই গাড়ি
    চালাচ্ছে আরিফ। আজাদ সাহেব দেখে বেশ খুশিই হন। তার দেখরেখে বেশ ভালোই গাড়ি চালানো শিখেছে তার ছেলে।
    কিছুটা নিশ্চিন্ত হোন তিনি। কিছুটা অন্যমনস্ক হয়ে পড়েন আজাদ সাহেব। হঠাতঈ কিছু একটার সাথে গাড়িটার
    ধাক্কা লাগে। লাফিয়ে উঠেন তিনি। কিছু দূর গিয়ে গাড়ি ব্রেক করে আরিফ। আজাদ সাহেব জিজ্ঞেস করেন কি হয়েছে।

আরিফ ঘামতে ঘামতে বলে কেউ ধাক্কা খেয়েছে গাড়ির সাথে। আজাদ সাহেব চোখ বড় বড় করে পেছনে তাকান।
রক্তাক্ত একটি লোকের দেহ রাস্তায় পড়ে আছে। রক্তে লাল হয়ে গিয়েছে পিচঢালা রাস্তাটা। ভীড় জমতে শুরু করেছে।
কিছু লোক তেড়ে আসছে তাদের গাড়িটার দিকে।আজাদ সাহেব টেনে আরিফকে পিছনের সিটে পাঠিয়ে দিলেন। তারপর
নিজে ড্রাইভিং সিটে বসে স্ববেগে টান দিলেন গাড়িটা। পিছনে ধোয়া ছড়িয়ে ছুটে চলল গাড়িটা। আরিফ একবার পিছনে
তাকালো। রক্তাক্ত লোকটার পাশে ৫-৭ বছরের ছোট্ট একটি ছেলে চিৎকার করে কিছু বলছে। ভয়ে আরিফের মুখ
দিয়ে কোন আওয়াজ বের হচ্ছেনা। একদম নিস্তব্ধ হয়ে গিয়েছে সে।
গ্যারেজে গাড়িটা ঢুকিয়ে পুরো গাড়িটাকে কভার দিয়ে ঢেকে ফেললেন আজাদ সাহেব। তারপর আরিফকে হাত ধরে টেনে
বাড়ির ভিতরে নিয়ে এসে উত্তেজিত কন্ঠে বলতে লাগলেন, বলেছিলাম কোন অঘটন ঘটে যেতে পারে। তোমার এই বয়স
ড্রাইভিংয়ের জন্য উপযুক্ত না। শুনলেনা আমার কথা। দেখলেতো কি হলো। এখন এক সপ্তাহ ঘর থেকে বের হবেনা।
রুমের মধ্যে বসে থাকবে। আরিফ কি বলবে কিছুই বুঝতে পারলনা। সোজা রুমে গিয়ে দরজা লাগিয়ে দিলো।
২০ বছর হয়ে গিয়েছে ঘটনাটার। পরে আর কোন সমস্যা হয়নি। কেউ জানতেই পারেনি আরিফ একটা লোককে গাড়ি
দিয়ে মেরে দিয়েছে। তবে ঐ ঘটনার পর আরিফ আর কখনো গাড়ি চালায়নি।আরিফের এখন ছয় বছরের একটি ছেলে
আছে। সব কিছু ঠিক ঠাকই চলছিল এতদিন। কিন্তু হোঠাৎ একদিন তার অতিত তার সামনে এসে দাড়ায়।সেদিন
সকালে আরিফ তার ছেলেকে স্কুলে নিয়ে যাবার সময় রাস্তা পার হচ্ছিল। হঠাৎ কোথেকে একটি গাড়ি এসে স্ববেগে
ধাক্কা দেয় আরিফকে। আরিফ হুমড়ে পড়ে যায় রাস্তায়। মাথায় প্রচন্ড আঘাত লাগে। অজ্ঞান হয়ে যায় সে। গাড়িটি
একটু সামনে গিয়ে দাড়িয়ে যায়। গাড়িটা থেকে ২৬-২৭ বছরের একজন যুবক বেরিয়ে আরিফের দিকে ছুটে আসতে থাকে।
লোকটাকে ঘিরে ধরে সবাই।মার মার বলে ঝাপিয়ে পড়ে তার উপর। লোকটি নিজেকে বাঁচানোর চেষ্টা করে চিৎকার
করে বলতে থাকে থামুন আপনারা। এই লোকটাকে হাসপাতাল নিয়ে যেতে হবে। আমাকে সাহায্য করুন।লোকটার কথা
শুনে সবাই থেমে যায়। কয়েকয়টা কিল-ঘুষি লেগেছে লোকটার মুখে। ফুলে লাল হয়ে গিয়েছে মুখ। সবাই ধরাধরি করে
আরিফকে লোকটার গাড়িতে উঠিয়ে দিলো। আরিফের ছেলেটি আরিফের সাথে গাড়িতে গিয়ে বসল। লোকটি দ্রুত
হাসপাতাল নিয়ে গেলো আরিফকে।
ধীরে ধীরে জ্ঞান ফিরে আরিফের। চোখ মেলতেই সে দেখতে পায় তার ছেলে তার পাশে বসে কান্না করছে। আরিফ তার
ছেলের মাথায় হাত রাখে। তখন কেউ একজন বলে উঠে আপনি ঠিক আছেন? আরিফ মাথা ঘুরিয়ে লোকটার দিকে
তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল আপনি কে? 

  • আসলে আমার গাড়ির সাথে ধাক্কা লেগে আপনি অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলেন। তাই আপনাকে হাসপাতাল নিয়ে এসেছি
    বলেই লোকটা আহ করে একটা শব্দ করল। আরিফ উদ্বিগ্ন হয়ে জিজ্ঞেস করল কি হয়েছে। লোকটি হাসতে হাসতে
    বলল ও কিছুনা। কাউকে গাড়ি দিয়ে ধাক্কা দিলে যা হয় আর কি। লোকজন পিটুনি দিতে এসেছিল। কয়েকটা কিল ঘুষি
    লেগেছে বলে লোকটা হাসতে লাগলো। 
  • আপনি মার খেতে পারেন জেনেও গাড়ি থামিয়ে আমাকে সাহায্য করতে আসলেন কেন। 
  • আসলে আমি আপনার জন্য গাড়ি থামাইনি। আরিফের ছেলেকে দেখিয়ে লোকটি বলল আমি আসলে এই বাচ্চাটার
    জন্য গাড়ি থামিয়েছি। আরিফ অবাক হয়ে বলল, আমার ছেলের জন্য গাড়ি থামিয়েছেন! লোকটি বলতে লাগল হ্যা,
    আপনার ছেলের জন্য।আপনার ছেলের মতই বয়স ছিল আমার সেসময়। আমার বাবা আমার হাত ধরে রাস্তা পার
    হচ্ছিলেন। হঠাৎ কোথেকে একটি গাড়ি এসে আমার বাবাকে জোরে ধাক্কা দেয়। বাবা আমাকে ধাক্কা দিয়ে সামনে
    ফেলে দেয় তাই আমি বেচে যাই। তারপর গাড়িটা সেখান থেকে চলে যায়। আমি চিৎকার করে সবাইকে বলতে থাকি
    আমাকে সাহায্য করুন। কিন্তু কেউই এগিয়ে আসেনি। সবাই শুধু দাড়িয়ে দাড়িয়ে তামাশা দেখছিল। আমি আমার বাবাকে
    বাঁচাতে পারিনি। তাই আমি জানি চোখের সামনে এভাবে নিজের বাবাকে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখা একটা
    ছেলের জন্য কতটা কষ্টের। কতটা অসহায়ের। আমি সেখান থেকে পালিয়ে গেলে সবাই হয়ত আমাকে গালি গালাজ
    করত। ধিক্কার দিত।কিন্ত কেউ আপনার ছেলেকে সহযোগীতা করতে আসতনা। সবাই শুধু দাড়িয়ে দাড়িয়ে তামাশা
    দেখত।
    লোকটির কথা শুনে আরিফের তার ২০ বছর আগে করা অপরাধের কথা মনে পড়ে গেলো। সেদিন রক্তাক্ত লোকটাকে
    সহযোগিতা না করে পালিয়ে এসেছিল সে। সেদিন রক্তাক্ত লোকটার পাশে বসে থাকা ছোট্ট ছেলেটি হয়ত এই লোকটার
    মতই হয়েছে এতদিনে। হয়তবা এঈ লোকটিই সেই ছোট্ট ছেলেটি যার বাবাকে সে মেরে ফেলেছে।আরিফের উপলব্ধি হয়
    সেদিন সে কত বড় ভূল করেছিল। আরিফ আর চিন্তা করতে পারেনা। মুখ ফিরিয়ে নেয় লোকটা থেকে। আরিফের চোখ
    বেয়ে গড়িয়ে পড়ে এক ফোঁটা অশ্রু।

আমরা সাহিত্য চর্চাও করবো না, লেখকও তৈরি করবো না, সম্পাদনাও করবো না, কেবল প্রকাশ করবো স্বপ্ন আর সৌহার্দ্য।

আপনার লেখা আজেই পাঠিয়ে দিন শুভ্র কাগজে। এই কাগজ প্রকাশ করবে আপনার প্রীতি।