কৃতজ্ঞতা

লিখেছেন
উবায়দুল ইসলাম

নিঝুম নিস্তব্ধ রাত। ঘন কালো আঁধার। মেঘের আবরণে চাঁদের আলো ঝাপসা হয়ে আছে। বাংলা বারমাসের নাম গণনা করতে করতে পৌষ মাসে এসে থামে শফিক। শফিক বলে, ভাই এখন পৌষ মাস চলছে। বড়ভাই মাহফুজ মাথা নেড়ে সায় দেয়। একারণেই ঠাণ্ডার প্রকোপটা ধীরে ধীরে বেড়ে চলছে।
হালকা কুয়াশার সাথে ঝিরঝির ঠাণ্ডা বাতাস। শীতের কাপড় নাই। একটা হালকা ভারী চাদর গায়ে জড়িয়ে দিয়ে কুয়াশার পর্দা ভেদ করে হেঁটে চলছে অনবরত। অভাবের সংসারে এরচেয়ে বেশিকিছু হয় না। অনেকটা নুন আনতে পানতা ফুড়াই এর মতন।
গ্রামের আঁকাবাঁকা পথ ধরে হাঁটছে দুই ভাই। মাথায় সবজির বোঝা। আলো আসার পূর্বেই পৌঁছতে হবে সবজির হাটে। আর না হয় খাদ্য জুটবে না।এটাই তাদের উপার্জনের মাধ্যম। তাদের দিকেই তাকিয়ে রয়েছে ছয় ছয়টি মুখ।
কখন ফিরবে,কখন পেট পুরে খাবে সেই আশায়,সেই ভাবনায় বসে থাকে সবকটি সত্ত্বা। মধ্যরাত হতে না হতেই ডাক দিয়ে দিয়েছেন মা।
আজানের সময় হয়ে যাবে ঘন্টা দুয়েক পর। এটা ভেবেই ডাক দিয়ে ঘুমিয়ে পড়েন মা শাফিয়া বেগম।
এত তারাতারি রাত পেরিয়ে গেল!বোধ হয় রীতিমত ডাকার অভ্যাস বলে ঘুমের ঘোরে কথা বলেছে। না,তা কী করে সম্ভব!
মা ডাক দেবার জন্যই না অপেক্ষায় থাকতেন। ডাক মিস তো সবার খাওন মিস। এই ভেবে ঘুম থেকে উঠে যায় মাহফুজ। অভাবের সংসারে সব সহজ। কারণ বাস্তবতার সম্মুখিন হলে পরিস্থিতি মানুষকে পাল্টে দেয়। মাহফুজ সংসারের বড় ছেলে। পরিবারের সবচেয়ে বড়সন্তান তার প্রাণের বোন। তাকে ঘিরেই তার বাঁচা মরা।
শৈশবে সারাদিন পিছন পিছন ঘুরঘুর করতো। বোন শাফিকাও ছোটভাইকে প্রাণের চেয়েও বেশি ভালবাসে। মাহফুজ
ছোট ভাইয়ের পিঠে আলতোভাবে স্পর্শ করে বল্লো;এই শফিক শীঘ্রই উঠ। হাটে যেতে হবে।
”ঘড়ি নেই’। কয়টা বাজে যে দেখে নিবো”। চোখ কচলাতে কচলাতে ভাইয়ের ডাকে উঠে গেলো শফিক।
নিশ্চুপ রাতে দু’জন চলতে লাগলো। পথে পথে সবজির বোঝা অদল-বদল করে যেতে লাগলো বাজারের দিকে। নির্জন পথ বেয়ে কত দূর চলে এলো। মুয়াজ্জিনের কোন খোঁজ খবর নাই আজান দেবার। আজ কি তবে সব মুয়াজ্জিন চুক্তি করেছে আজান দেবে না!
বাজারের খুব নিকটে না হলেও কাছাকাছি চলে এসেছে। নদী পার হলেই বাজার।
কত কত পথ!কত কত ক্ষেত!কত কত মাইল হতে পারে! অনুভব শক্তি নষ্ট হয়ে গেছে যেন দুজনের।
মুয়াজ্জিন কেন আজান দেয় না?এ প্রশ্ন দুজনের ভেতরে ঘুরপাক খাচ্ছে। একটা পর্যায় শফিককে বলল, তুই বাড়িতে চলে যা। সকালে বাবার জন্য আবার খাবার নিতে হবে। শফিক ফিরে আসার পথ ধরলো। আসতে আসতে বাড়ির কাছাকাছি চলে এসেছে।
ভেতরে ভয় ঢুকে গেল। এত এত মাইল,এত এত আইল বেয়ে গেলাম, আবার আসলাম!এখনো মুয়াজ্জিন আজান দিলো না!এখনো রাতের পরিসমাপ্তি ঘটে আলোর বিচ্ছুরণ ঘটলো না!তার মানে মা ভুল সময়ে ডেকে দিয়েছেন।
আর ভাইয়াও মা’র ভুল ডাকের অনুসরণ করে বেরিয়ে গেছে ঘর থেকে। বাড়িতে এসে বুঝতে পারে আজানের দেবার সময় হয়নি এখনো। হালকা খাবার খেয়ে ক্লান্ত শরীরকে মাটিতে বিছানাে বিছনায় এলিয়ে দেয়। পরমুহূর্তে শান্তির ঘুমে হারিয়ে যায়।
.
সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে মা’র ডাকে।অজু করে কুয়াশার চাদর ভেদ করে ছুটে মসজিদের পানে। নামাজ পড়াটা পারিবারিকভাবে বাধ্যতামূলক। নামায না পড়লে খাবার জুটে না কারো মুখে। এমনিতেই খাবার জুটে না।তারপর আবার শর্ত জুড়ে দিছে নামায না পড়লে খাবার বন্ধ।
এসবের শর্তসাপেক্ষ ধার ধারে না কেউ। মক্তব পড়াকালীন নামায পড়া শুরু করেছে। নামায কখনো ছেড়ে দেয় না।সবকিছুর ভেতর দিয়ে নামাযকে যথাযথভাবে পালন করা চাই। অভাবের সংসার হলেও তাদের মনগুলা ভাল ছিলো। সবসময় খোদার আদেশ পালন করতে সচেষ্ট ছিলো।
আলস্যভাবকে দূর করে চলে যায় মসজিদে।নামায শেষে দাদার কবর জিয়ারত করে বাড়িতে ফিরে আসে। তারপর মার কাজ এগিয়ে দিয়ে বাবার খাবার নিয়ে স্কুল পথে রওনা হয়।
সবগুলা পড়া আদায় করে নিতো ক্লাসেই।যেন ক্লাসের বাইরে পড়তে না হয়।ভেতরে চাওয়া,পাওয়ার আকাঙ্ক্ষাটা ছিলো তীব্রভাবে। নিজেকে পিছনে হটে দেবার মানুষ ছিলো না।সবসময় নিজেকে প্রমাণ করতে চাইতো; আমিও পারি।
এতকিছুর পরেও রোল নাম্বার এক থেকে তিনের ভেতর থাকতো।
স্কুলের স্যাররাও প্রশংসার বাণী শুনিয়ে বলতো।তুই একদিন বিশাল বড় হবি।এখন সে আফসোস করে পড়ালেখায় বড় হতে পারেনি।পেরেছি টাকার অংকে বড় হতে।একসময় শিক্ষার মূল্য ছিলো অনেক।এখন টাকার।শিক্ষা এখন টাকার কাছে বিক্রি।

• পাঁচ তলা বাড়ীর তৃতীয় তলার দক্ষিণের বারান্দায় বসে গায়ে হাওয়া মাখছে শফিক। কত বাতাস!আহ বাতাস!তুমি একসময় হও মানুষের শান্তির কারণ ; আরেকসময় অশান্তির। অথচ আমরা বেঁচে আছি তোমা থেকে অক্সিজেন গ্রহণ করে। এসব মনে করে হু হু করে কেঁদে উঠে শফিক। ভাবা যায়!সে আজ এত বড়লোক হবে!কখনো ভাবেনি। খোদা যেন তার দু’হাত ভরে দিয়ে দিছে।
এখন আর ছনের ঘরে শুয়ে থাকতে হয় না। কিংবা খাবারের জন্য অপেক্ষা করতে হয় না। মার নিকট খাবার চাইলে ‘নাই’ শব্দটি শুনতে হয় না। ছোট ভাইবোনগুলাও খাবারের জন্য প্রতিক্ষায় থাকে না।
অভাবের সংসার এখন আর নাই। কষ্টের দিনগুলো কমে এসেছে। সকাল সকাল সবকাজ শেষ করে স্কুলে যাওয়ার তাড়া নেই। তারপর স্কুল থেকে ফিরে এসে রান্নার জন্য খড়কুটো কুড়াতে যাওয়া হয় না। সন্ধ্যায় ফিরে গোসল সেরে আবার পড়তে বসা হয় না।কত মধুর ছিলো! মাহফুজ,শফিক,শাফিকাদের পরিবার এখন ভাল আছে। ভাল আছে তাদের ভাইবোন নিয়ে দশজনের পরিবার। কত কত পয়সার মালিক শফিক এবং তার ভাইরা।
শফিক এসব ভেবে কৃতজ্ঞতায় চোখ দিয়ে সুখের অশ্রু ঝরায়। চেষ্টা,প্রচেষ্টা আর বুকে বল নিয়েই সামনের পথে অগ্রসর হয়েছে সবসময়। নিজেকে দমিয়ে রাখেনি।
যেখানেই ঠেকেছে,সেখানেই শিখেছে।ব্যবসা বাণিজ্যের জন্য দেশ-দেশান্তর ঘুরে বেড়ায়। এখন সে এলাকার ধনী লোকদের কাতারে।
স্রষ্টার প্রতি কৃতজ্ঞতায় মত্ত থাকে সসবসময়।
সন্তান সন্ততিদের বলেন,মাল সম্পদ নিয়া ঈর্ষা করবে না।সবসময় স্রষ্টার প্রতি কৃতজ্ঞতায় মত্ত থাকবে।কৃতজ্ঞতা’ই সবকিছু ঠিক রাখে। আজকে মানুষজন কৃতজ্ঞতা করা ভুলে গেছে। কৃতজ্ঞতা করলে সম্পদে বরকত হয়।এবং শতগুণ বৃদ্ধি করে দেয় মহিয়ান খোদা।

আমরা সাহিত্য চর্চাও করবো না, লেখকও তৈরি করবো না, সম্পাদনাও করবো না, কেবল প্রকাশ করবো স্বপ্ন আর সৌহার্দ্য।

আপনার লেখা আজেই পাঠিয়ে দিন শুভ্র কাগজে। এই কাগজ প্রকাশ করবে আপনার প্রীতি।