ছ্যাকাটা লেগেছে হৃদয়ে

– তোফাজ্জল হুসাইন

কিছুদিন আগে বন্ধু পাশে এসে বসে কাচুমাচু করে বললো সে একটা কথা বলবে। আমি কফি খেতে খেতে টাইমলাইন স্ক্রল করছিলাম। তার হাবভাব দেখে মোবাইল পকেটে রাখলাম, সর্বোচ্চ মনোযোগ বন্ধুর দিকে দিয়েছি এমন ভাব করে বললাম, হ্যা বল কী কথা?
আমার বন্ধু ক্লাস থ্রির ছেলেদের মতো এক পড়া স্যার যখন তিনদিন পড়ানোর পর বলে দেয়, কাল যে পড়া না পারবে তার পাছার ছাল তুলে ফেলবো! সেরকম প্রস্তুতি নিয়ে বলা শুরু করলো।
-দুস্ত আমি একটা প্লান করেছি! মোবাইল টেবিলে রেখে শার্টের হাতটা গোছাতে গোছাতে বলছে সে। তার প্লান হলো ফেইসবুকে তো সব রকমের গ্রুপ ই আছে, চিরকুমার দের গ্রুপ, রোমান্টিক প্রেমিক প্রেমিকাদের গ্রুপ, কবি সাহিত্যিকদের গ্রুপ, মুভি লাভার এবং বিভিন্ন সেলেব্রিটির ফ্যান রাও গ্রুপ চালাচ্ছে। আজকাল আবার নিজের নামেও গ্রুপে ইনভাইট আসছে ফেসবুকে। তো আমার বন্ধুর প্লান সেও একটা গ্রুপ খুলবে, তবে সেটা হবে একদম ভিন্ন টাইপের। যে গ্রুপ ফেসবুকে ইতোপূর্বে কেউ খুলেনি। গ্রুপ টা হবে স্রেফ ছ্যাকা খোরদের জন্য। রিলেশনে যারা পিউর ছ্যাকা খোর তারাই থাকবে গ্রুপে। গ্রুপের নাম হবে, “ছ্যাকা টা লেগেছে হৃদয়ে”।
বন্ধু আমার কথা গুলো বলছে আর এমন এক্সপেকটেশন দিচ্ছে যেন বিরাট একটা প্রজেক্ট এর আর্কিটেক্চার কে সে তার ডিজাইন বুঝাচ্ছে।

-মনে কর যে আমাদের গ্রুপে নতুন পুরাতন সব রকমের ছ্যাকা খোর ই থাকবে। নতুন যারা প্রেমে ছ্যাকা খেয়েছে, তারা বড়ো বড়ো কবিতা লিখবে, মনের দুঃখ লিখে স্ট্যাটাস দিবে, সেগুলো সব এপ্রুভ করা হবে গ্রুপে। দুয়েকজন মডারেটর ও লাগবে গ্রুপের জন্য।
আমি অনেক কষ্টে হাসি চেপে তার কথা শুনে যাচ্ছি। আর এমন ভাব নিচ্ছি যেন তার কথায় আমার অনেক মনোযোগ। কী করবো? রাকিবের স্বভাব আমার থেকে ভালো কেউ জানে না, ওর কোন চিন্তা মাথায় আসলে সেটা নিয়ে সারাক্ষণ বকবক করে যাবে। এখন ফ্রি আছি তাই শোনার ভান করে বিপদ মুক্ত হয়ে যায়। না হলে কাজের মধ্যে, খেতে বসে, ইভেন ক্লাসেও এই বিষয়টা নিয়ে বলতেই থাকবে। তার প্লান পুরো টা আমাকে না শুনিয়ে নিস্তার দিচ্ছে না। একবার রাকিব ছুটি কাটয়ে হোস্টেলে ফিরেছে। তার গ্রামে কী একটা ঘটনা ঘটেছে সেটা বলবে আমাকে, এসাইনমেন্ট করছিলাম আর রাকিব বকবক করছিলো। এসাইনমেন্ট শেষ করে বললাম কী বললি বুঝিনি তো! তারপর হলো এক কান্ড। ক্লাসে চলে এসেছি, স্যার আসার আগে রাকিব আবার বলতে শুরু করলো তার গ্রামের ঘটনা, কোন এক খেজুরের রস বিক্রেতা সাইকেল চালাতে গিয়ে রসের মটকা সহ খাদে পড়ে যায়। স্যার ক্লাসে আসার পরও তার গল্প শেষ হয় না। সে মুরুব্বি লোক দেখে বাড়ী তে নিয়ে দিয়ে আসে, সেখানে এই লোকের সুন্দরী মেয়ে কে দেখে… কথা বলতে দেখে স্যার পুরো ক্লাস দুজন কে ব্যঞ্চে দাড় করিয়ে রাখে। এমন অহরহ ঘটনা আছে রাকিবের সাথে। তাই তার প্লান এখন বসেই শুনে ফেলা ভালো। এসাইনমেন্ট করতে সময় জ্বালাবে না। ক্লাসেও মাথা খাবে না আর।

  • আর পুরাতন ছ্যাকা খোররা তো লিখতে লিখতে এক সময় ক্লান্ত হয়ে যায়, তবে তারাও দুই তিন লাইনের শায়ের লিখে, সেগুলো ও এপ্রুভ করা হবে। গ্রুপ টা কে হিট করে ফেলবো অল্প দিনেই।
    রাকিবের বিরতিহীন বলে যাওয়া প্লান আমিও বিরতি ছাড়াই শুনলাম। বললাম
    -জোশশ আইডিয়া দুস্ত, আমাকে কিন্তু এডমিন দিবি।
    রাকিবের কথায় আমার সহমত আছে তার মানে যেন সুপ্রিম কোর্ট রাকিবের পক্ষে রায় দিয়েছে, তার থেকেও বেশি প্রফুল্ল হতে দেখা যায় তাকে। চা-স্টলে বসেই রাকিব গ্রুপ খুলে ফেলে।
    “ছ্যাকা টা লেগেছে হৃদয়ে”
    গ্রুপে দুইজন মেম্বার, দুইজন ঐ এডমিন প্যানেলে। আমি আর রাকিব। রাকিব তার লিষ্টের সবাইকে গ্রুপে ইনভাইট পাঠাচ্ছে। আমাকেও ইনভাইট করার জন্য বললো সব ফ্রেন্ড দের। ভয় হচ্ছে লিষ্টে প্রেমিক-প্রেমিকা আছে, সিনিয়র বিবাহিত বড়ো ভাই আছে, ২০-২৫ বছর যাবৎ সিংগেল থাকার দহনে পুড়ছে এমন ভাই ব্রাদারদের যদি ছ্যাকা খোর গ্রুপে ইনভাইট দিই, আমার কী অবস্থা করবে তারা।
    উবার করে হোস্টেল এসে বিল চেক করার সময় ড্রাইভার এর ফোনে দেখলাম মেসেঞ্জার হ্যাড চ্যাটে, আরিশা খানের ছবি ওয়ালা আইডি থেকে “বাবু বিকেলে কিন্তু নিউমার্কেট থাকবা” মেসেজ এসেছে। রাকিব ড্রাইভার কে বললো, ভাই এফবি ইউজ করেন?
    -হ্যা ভাইয়া (ড্রাইভার)
    রাকিব ঝটপট মোবাইল চেয়ে নিয়ে রিকুয়েষ্ট সেন্ট করে তার আইডি তে। সাথে সাথে এক্সেপ্ট করে গ্রুপে ইনভাইট করে এবং নিজের হাতেই জয়েন দিয়ে দেয়। “ছ্যাকা টা লেগেছে হৃদয়ে” গ্রুপে তিনজন মেম্বার হলো।

আমরা সাহিত্য চর্চাও করবো না, লেখকও তৈরি করবো না, সম্পাদনাও করবো না, কেবল প্রকাশ করবো স্বপ্ন আর সৌহার্দ্য।

আপনার লেখা আজেই পাঠিয়ে দিন শুভ্র কাগজে। এই কাগজ প্রকাশ করবে আপনার প্রীতি।