জোসনা বিলাসের রাতে দলে দলে জোনাকি

লিখেছেন
আতিক ফারুক

একটু পর নদী, একটু পর-ই নদী। এক বিকেলে এভাবে বলতে বলতে বহুদূর নিয়ে গিয়েছিল আমাকে। তবু— নদী আর দেখা হয় না সেদিন। ক্ষীণ আক্ষেপ, ক্ষীণ ক্ষোভ, ক্ষীণ অভিমান নিয়ে সেরাতে না খেয়ে-ই ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। আম্মুর শরীর অসুস্থ বলেই কেউ আর আমার অভিমান ভাঙায় নি। বাবা চাকরিসূত্রে ঢাকা থাকেন; সপ্তাহ পরপর বাড়ি আসেন। বড় ভাই ক’দিনের জন্য শ্বশুরবাড়ি গিয়েছেন বেড়াতে। বৃহস্পতিবার বলেই মাদ্রাসা থেকে মেঝোভাইয়া বাড়িতে এসেছেন। কাল বিকেলে আবার চলে যেতে হবে। মেঝোভাইয়া বাড়িতে আসলেই অন্যরকম ভালোলাগা কাজ করত আমার মনে। ভীষণ ডানপিটে, দুরন্ত, চঞ্চল কৈশোরে ভর করে সবরকম দুষ্টুমি বাঁদরামি করে বেড়ায় তখন। একারণেই ভাই আসলে এক অদ্ভুত আমেজ তৈরি হত মনে৷ ঘরের কোণে থাকতে থাকতে একরকম একঘেয়ে বিরক্তি ; মেঝোভাই বাড়িতে আসলেই যেন সকল একঘেয়েমি দূরীভূত হয়ে যায়। 

বৃহস্পতিবার বিকেলে ভাইয়া আমাকে নদী দেখাবে বলে কোথায় যেন নিয়ে গিয়েছিল! ধূ ধূ ফসলের মাঠ চিরে, বিকেলের নরম রোদে— নদী দেখার লোভে ভাইয়ার সাথেসাথে এগুচ্ছিলাম। ক্রমশ সন্ধ্যা  হাতছানি দিচ্ছে পশ্চিমের আকাশে। দূর কোথাও কোনো অচিন পাখির ডানায় যেন ভর করে নামছে সন্ধ্যা। ভাইয়ার হতবিহ্বলতা, নদী দেখানোর  ক্ষিপ্রতা তার চোখে-মুখে পরখ করা যেত। আমরা হাঁটি, কথা বলি— ভাইয়া তার মাদ্রাসা থাকাকালীন বিভিন্নরকম গল্প শুনায়, আবাসিক থাকার কী কষ্ট, যাতনা সবরকম গল্প শুনি, হেসে কুটিকুটি হয়ে পড়ি আবার বিষণ্ণও হই যখন শুনি— পড়া না- পারার কারণে হুজুর’রা ভাইয়ার পিঠে বেত তোলে। 

এতক্ষণে চারদিক আঁধারে- আঁধারে ছেয়ে গেছে। মাগরীবের আজান হচ্ছে সবখানে, কী সুমধুর আজান! পৃথিবীর সবচেয়ে মধুর এই বাণী মনকে মুহূর্তেই আনন্দিত করে ফেলে। ভাইয়া বললেন: ’সামনে নদীর পারেই মসজিদ আছে— ওখানে নামাজ পড়ুম, তারপর নদী দেখুম; রাতের নদী মেলা সুন্দর’  আমি যারপরনাই পুলকিত হয়ে পড়ি। নদী তাহলে দেখা হচ্ছে— রাতের নদী, কী অপূর্ব! 
একটি টিনের মসজিদ, খুব জীর্ণ-শীর্ণ। টিউবওয়েল চেপে-চেপে আমরা অজু করে নামাজ পড়ি। 

নদীর পারে আসা হল; কী ঝকঝকে- তকতকে, ফকফকা আকাশ এবং জোসনার আলো ঠিকরে পড়ছে নদীর পানিতে। থেকে- থেকে অজস্র তারা— যেন এখনি খসে পড়বে। ভাইয়া আমার বিহ্বলতা দেখে মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে থাকে দীর্ঘক্ষণ। কোথাও ঝিঁঝি ডাকছে, দলে দলে জোনাকি’ও বেরিয়ে আসল কোথা থেকে যেন। এ- যেন অদ্ভুতুড়ে কাণ্ড সব। জোসনা, মিটিমিটি তারকা, নদী, জোনাকি এবং ঝিঁঝি পোকাদের সমারোহে তুমুল বিমুগ্ধতা জাপটে ধরে আমাকে। দেখি, জোসনা বিলাসের রাতে দলে দলে জোনাকি আমাকে ডাকছে, কোথায় যেন উড়ে যাচ্ছে ওরা! যদি ওদের সঙ্গী হওয়া যেত! 

আমরা সাহিত্য চর্চাও করবো না, লেখকও তৈরি করবো না, সম্পাদনাও করবো না, কেবল প্রকাশ করবো স্বপ্ন আর সৌহার্দ্য।

আপনার লেখা আজেই পাঠিয়ে দিন শুভ্র কাগজে। এই কাগজ প্রকাশ করবে আপনার প্রীতি।