তোমার জানালার শার্সিতে আমার প্রতিবিম্ব

তোমার জানালার শার্সিতে আমার প্রতিবিম্ব। বিকেলের শেষ রোদে ধুয়ে যাচ্ছে শহর। আমার বারান্দার গ্রিল গলে কিছুটা রোদ চলে এসেছে বুক পকেটে। একটা ভীষণ মন করা বাতাস বয়ে যাচ্ছে কানের পাশ দিয়ে। এইসব বাতাসের ব্যাকরণ বুঝতে পারাটা মুশকিল। অন্তত আমি পারিনি। গত সোমবার মাঝরাতে একটা কফিন ধরে চোখ বন্ধ করার পর বাতাসটা বয়ে যাচ্ছিল। ঠিক এখনকার মতো; কানের পাশ দিয়ে। পাতলা কাপড় ছেঁড়ার মতোন মিহি একটা শব্দ। বাতাসে নাক ডুবালে একটা ঘ্রাণ পাই আমি। ঝাঁঝালো মিষ্টি ঘ্রাণ। মিষ্টি আবার ঝাঁঝালো হয় নাকি! কিজানি৷ আমার এই অব্দি জীবনে মন খারাপ করা বাতাসের সাথে পরিচয় অনেক দিনের। ঠিক কবে থেকে শুরু? মনে নেই। হয়তো সেদিন, যেদিন বাবা সাইকেলে চড়ে অফিসে যাচ্ছিলেন। আমি টুলের উপর দাঁড়িয়ে জানালার শিক ধরে দেখছিলাম। তারপর হঠাৎ মন খারাপ করা বাতাসে টুলটা পড়ে গেলো। সেইসাথে আমিও। ছোট্ট নরম তুলতুলে খরগোশের মতো ডান হাতের হাড়টা ভেঙে গেলো। ওইদিন, নাকি আরো আগে? থাক কী দরকার এসব মনে করবার। বরং সামনে আগানো যাক।

প্রথমটাই লাইনটাতে ফিরে যাই। তোমার জানালার শার্সিতে আমার প্রতিবিম্ব। এই, এই ‘তুমিটা’ – কে? মন খারাপ করা বাতাসের মতো তুমিদের ব্যকরণ বুঝতে পারাও মুশকিল। আমি এখানেই হেরে গেছি। শ্রীজাতের গদ্যে সেদিন পড়লাম –পরাজয়ের নেশা অর্জনের চেয়ে ঢের বেশি। মরণ অব্দি অর্জনই কী সব? সেদিন হোস্টেলে আমার দুই রুমমেট কথায় কথায় জানালো আমার অর্জন দেখে তারা ঈর্ষান্বিত। আর নিজেদের জীবন নিয়ে যারপরনাই হতাশ। আমি ওদের কথা শুনে অট্টহাসিতে ফেটে পড়েছিলাম। একেঅপরের দিকে চোখাচোখি করে মহাবিস্ময় অথবা বিরক্ত নিয়ে আমার দিকে তখন ওরা তাকিয়ে। আমি ওদের বলেছিলাম পরাজয়ের কথা। আমার অসংখ্য পরাজয়ের ভিতর থেকে একটা কী দুটো। দেখি, দেখি চোখ ছলছল। চুপচাপ নিজের কাজে ফিরে গেলো সব। আমি বারান্দায় গিয়ে কিছুটা সময় আকাশ দেখলাম। দূরের রাস্তায় বাচ্চা কুকুরের কুঁইকুঁই করে ডাকতে থাকা, ঘ্যাচঘ্যাচ আওয়াজ তুলে পথ মাড়ানো ট্রাকের চাকা আর এক অপরিচিত পথচারীর মুঠোফোনে বাজতে থাকা রিংটোন মিলে অপূর্ব এক ছন্দ তৈরি করেছিল। ঠিক তখনই বয়ে যাচ্ছিল মন খারাপ করা বাতাস।

ভাষা, মন আর সমাজের ব্যকরণ না বুঝেও দিব্যি বেঁচে আছি। সবকিছু থেকে আলাদা হতে হতে তৈরি করে ফেলছি নিজস্ব ব্যাকরণ। এই যেমন– আমার মতে, বিমর্ষতা ছাড়া বেঁচে থাকা সম্ভব নয়। সবকিছু পূরণ হওয়ার পরেও আর্টিফিশিয়াল বিমর্ষতা তৈরি করতে হয়। আকাশ ছুঁয়ে দেখা যায় না, পাখির মতো উড়া যায় না, প্রেমিকার মন পড়া যায় না, মেঘের ভেলায় ভাসা যায় না। এতকিছুর ভিড়ে সুখী হওয়ার সুযোগ কই? বস্তুত পৃথিবীর সকল প্রাণীই, বিশেষত মানুষ চিরকালীন দুঃখী। সেই সাথে অর্ধমৃত। জন্মের পরপরই এক অনিশ্চিত যাত্রার মাধ্যমে প্রথম মৃত্যু হয়। আর বাকি জীবনে মৃত্যু হয় একটু একটু করে, ধুকতে ধুকতে। মানুষ কেবলই বেঁচে থাকবার অভিনয় করে। ইমরান মাহফুজের ভাষায় – কায়দা করে বেঁচে থাকে।

আমি বেঁচে থাকি ঝাঁকড়া চুলের নেশায়। একদিন মাথাভর্তি ঝাঁকড়া চুল হবে। থাকি বেঁচে কালজয়ী উপন্যাস লেখার আশায়। শৈশব থেকে জমিয়ে রাখা নোটবুকগুলো মাঝেমধ্যে খুলে খুলে দেখি। কতশত শব্দ। কেবল একটা শব্দ। কোনও পৃষ্ঠাই এলেমেলো কিছু লাইন৷ কোনও পৃষ্ঠাই কেবল সময় লেখা; দিন নেই, তারিখ নেই। ভেবেছিলাম একদিন এইসব অক্ষর দিয়ে লিখে ফেলবো বিপুল এক উপন্যাস। কিন্তু ঝাঁকড়া চুলের স্বপ্ন দেখে প্রতি মাসে বাবার আর শিক্ষকের ভয়ে কেটে ফেলা চুলের মতোই কেটে গেছে সব শব্দ। মিলিয়ে গেছে শখ। ফুরিয়ে গেছে সব গল্পের প্লট। সারাদিন মায়ের কাজে সাহায্য করে, কোলেপিঠে ভাইবোন মানুষ করে মাঝরাতে যে মেয়েটা অনলাইনে আসে লেখকের খবর জানতে, সে কী জানে এতকিছু?
অথবা হৈচৈ করে জীবন পার করতে চাওয়া মেয়েটা যে রাত করে একা একা কাঁদে, তার সাথে কী কখনও বলা হয়েছে এসব? প্রবল নারীবাদী যেই মেয়েটা ধার্মিকতা পছন্দ করে না সে কী জানে আমার মা গত তিরিশ বছর যাবত বাড়ির সব বাজার নিজে করেন। সমাজ, রাজনীতি আর অফিস সামলানো বাবা সংসার করেন দায়সারা৷ সমাজতান্ত্রিক চেতনা নিয়ে গোল জুব্বা পরে কাটিয়ে দেওয়া বারো বছরের খবর কী জানে মেয়েটা?

মৃত্যু, বিচ্ছেদ, বিদ্রুপের সাথে বিদ্রোহ করে বেঁচে থাকা এক নাগরিক গল্পকার। যে রোজ বারান্দায় গিয়ে বিড়বিড় করে বলে – ‘ তোমার জানালার শার্সিতে আমার প্রতিবিম্ব। ‘ যখন বয়ে যায় মন খারাপ করা বাতাস। কেউ কী জানে এসব বিষন্নতার খোঁজ?

Editor - Shuvro Kagoj

আমরা সাহিত্য চর্চাও করবো না, লেখকও তৈরি করবো না, সম্পাদনাও করবো না, কেবল প্রকাশ করবো স্বপ্ন আর সৌহার্দ্য।

আপনার লেখা আজেই পাঠিয়ে দিন শুভ্র কাগজে। এই কাগজ প্রকাশ করবে আপনার প্রীতি।