বিচ্ছেদ

ওবাইদুল ইসলাম :

– আমেনা।
‘আমাদের সম্পর্কটা টিকিয়ে রাখা সম্ভব না। আমাদের সম্পর্কে স্ব-স্ব কতৃত্ব নাই। সমাজে চলতে হলে,ফিরতে হলে প্রয়োজন সবার সাথে তাল মিলিয়ে চলা। তোমার আমার বয়সের ডিফারেন্স খুব হলে এক বা দুই বছর। বছর দুয়েক পর তোমার পড়াশুনা শেষ হবে। আর আমি পড়াশুনা শেষ করে জীবন যুদ্ধে নেমে পড়বো।’

ভেতরে চাপা কান্না আটকে রেখে ফোন কেটে দেয় রায়হান। জানালা দিয়ে উত্তরের বাতাস এসে চেহারায় লাগে। ঠাণ্ডা অনুভূত হয় শরীরে। শীত বুঝি চলেই আসলো।

এমন এক ঘোরলাগা শীতের বিকেলে আমেনার সাথে পরিচয় হয়েছিলো। মেয়েটা দেখতে কালো। শ্যামবর্ণের মতো তবে শ্যাম না। এই নিয়ে রায়হানের কোনো আক্ষেপ ছিলো না। হৃদয় যেদিকে ঝুঁকে যায় সেদিকে কোনো বিবেচনা যোগ্য হয় না। ভালোবাসার অপার মুগ্ধতা কাজ করে ।

আমেনা প্রথমে ভালোবাসার কথা বলেছিলো। হৃদয়ের আকুতি ব্যক্ত করেছিলো। রায়হান নির্দ্বিধায় মেনে নেয়। তার ডাগর ডাগর চোখ,দ্বীঘল কালো চুলের প্রেমে পড়ে যায়। তাকে দেখলেই রায়হানের ভেতর এক মোহ কাজ করে। এই মোহের অর্থ জানে না।

এক জোছনাভরা তারা রাতে রায়হান ভেতর ভেতর ভয় পুষে কল দেয়। উৎকণ্ঠায় হাত কাঁপে, কণ্ঠ ধরে আসে। কি এক অনুভূতি যেন তার ধরায় বাস করে!

অপর পাশ থেকে কল ধরে। কথা বলে। মেয়েটার কণ্ঠে কোনো ভীতি নাই। কি সুন্দরভাবে কথা বলে! রিন-রিন কন্ঠ। নদীর বুকে ঢেউয়ের ছলাৎ ছলাৎ শব্দের মতন হৃদয়ে আঘাত হানে প্রতিটা কথা। কি অদ্ভুতভাবে কথা বলে!

অল্পকয়েকদিনে আমেনার প্রেম বিবশ হয়ে যায়। বিভোল হয়ে পড়ে রিন-রিন কন্ঠের অতলে। ভালোবাসি বলে, ভালোবাসির কথা বলে, কখন যে সময় চলে যায়। কেউ বুঝতে পারে না।

রায়হান বলে,’আমি যদি বলি এ জগতে আপনার চোখগুলো অনেক সুন্দর। তবে আমার কথা বিশ্বাস করবেন? এ চোখে ডুব দিয়ে থাকা যাবে আজন্মকাল।’

আমেনা বলে, এখন তো আমি আপনার আপন কেউ। কাছের মানুষ। হৃদয়ের ক্ষত দূরকারিণী। আমার হৃদয়খানি আপনার হৃদয়ে প্রতিস্থাপন করে দিয়েছি। যেখানে আমার হৃদয় সে হৃদয়কে ভালোবেসে তুমি ডাকেন।

সব লজ্জা সংকোচ দূর করে সেদিন তুমি সম্বোধন করেছিলো। হৃদয়ে শিহরণ জাগে। প্রথম প্রেম এক অন্যতম ঘোরলাগা জগত। রায়হান কখনো ভাবেনি এই জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হতে হবে। বিচ্ছেদ ঘটাতে হবে একটা জগতকে।

বিচ্ছেদ ঘটার আগের রাত খুব করে ভাবে রায়হান। জীবন সম্পর্কে হঠাৎ করে সিরিয়াস হয়ে যায়। এই জগত থেকে ধীরে ধীরে ফিরে আসতে হবে। আর না হয় একটা সময় হঠাৎ করে বিচ্ছেদ ঘটলে সহ্য করার শক্তি পাবে না।

প্রেমের এক অনন্য মোহ থেকে বের হতে চায়। খুব শিঘ্রই বের হতে হবে। নিজেকে কন্ট্রোল করে,বুঝায়।
এক সন্ধ্যা রাতে রায়হান ফোন দেয়। হঠাৎ করে জানিয়ে দেয়। আমাদের সম্পর্ক সম্ভব না। যে সম্পর্কে স্থায়ীত্ব নাই। সে সম্পর্কে থাকতে চাই না। প্রতারক সেজে সমাজে বেঁচে থাকতে চাই না। তোমার আমার সম্পর্ক আদৌ জোড়া লাগবে না।

নিয়তিকে মেনে নাও। জীবনকে নিয়ে একটু ভাবো। আবেগ দিয়ে নয় বিবেক প্রাধান্য দাও। দিন কয়েক গেলে আমাদের জীবনের দৃশ্যপট বদলে যাবে।

সেদিন আমেনা খুব কেঁদেছিলো। ভালোবাসি বলেছি, হৃদয় দিয়েছি। আমি হৃদয় ফিরিয়ে নিতে পারবো। আমার হৃদয়ে মিশে আছে আপনার অস্থিমজ্জা।

খুব করে স্বপ্ন দেখতাম। আমরা একসাথে থাকবো। খুব বড় দালান কোঠা চাই না। ভালোবাসায় পরিপূর্ণ একটা কুড়েঘর হলে হবে। তিনবেলা খাবার না আপনার সাথে সারাদিন থাকতে পারলে হবে। খুব করে স্বপ্ন দেখতাম আপনাকে নিয়ে একসাথে হারিয়ে যাবো কোথাও।

আপনি যতদিন বলবেন আমি অপেক্ষায় থাকবো। আপনার কতবছর লাগবে? একটু বলেন। কান্নাজড়িত কন্ঠে বলে,আপনার সময় হলেই সপ্তাহে তিনবার কল দিবেন। আমার হৃদয়ের ক্ষত দূর করবেন।

রায়হান চুপ থেকে চাপা কন্ঠে বলে, ভেবে দেখবো। ভালো থেকো। চার বা পাঁচবছর। জানি তুমি পারবে না। আমার জীবন থেকে ভালোবাসা অনেক কঠিন।

দুই বছর পর। আমেনার পড়াশোনা শেষ। বাড়ি থেকে বাঁধা থাকা সত্ত্বেও একবছর চাকরী করে। অপেক্ষার প্রহর কাটে না।
বিয়ের প্রস্তাব আসে। পছন্দ মতো না হলেও বাড়ি থেকে চাপের কারণে নিয়তিকে আপন ভেবে নেয়।

******
আমেনার বিয়ে। বাড়িতে ছোট বাচ্চাদের উল্লাস। সাধারণ ভাবেই বিয়ের অনুষ্ঠান। কারণ আমেনা দ্বিতীয় বউ। তার হবু স্বামীর আগের বউ তালাকপ্রাপ্তা। টাকার লোভে হেরে যায় তার পরিবার। টাকাকে আপন করতে বিয়ের পিড়িতে বসতে হবে।
অথচ রায়হানের সাথে সংসার পাতার কথা ছিলো। রায়হানের সাথে একটা জগত কাটানোর কথা ছিলো।

এই কয়দিনে রায়হান কোনো খোঁজ নেয়নি। কথা বলেনি। হৃদয়ের ব্যথা উপশম করেনি। এখন সব অতীত। স্মৃতি হয়ে বাঁচবে। রায়হানকে ঘিরে শুধু একটা চিঠি নামক স্মৃতি আছে।

কত কত বছর কেটে গেলো। চিঠিটাও এখনো অক্ষত আছে। কোনো ভাজ নাই। চিঠির লেখায় হাত বুলায়। সব অতিত কথাগুলো ভেসে উঠে স্মৃতিতে। চিঠিতে লেখা।

পাশে থেকো,পাশে রেখো।
পাশে পাবে আজন্মকাল।

কাছে গেলে,কাছে টেনো।
কাছে পাবে চিরকাল।

মনে মনে,মনে রেখো।
মনে গেঁথে গেলে;
দূরত্ব ভুলে যাও।

এখন সব অতিত। বিশ্বাসঘাতকতা প্রকাশ পায়।

এক সন্ধ্যায় বাড়িতে ফিরে শহর থেকে। দুঃসম্পর্কীয় চাচা রায়হানকে নিয়ে যায় তার বাড়িতে। রায়হান কিছু জানে না।

বাড়ির গেইটে ঢুকেই ধাক্কা খায় রায়হান। একটা জগত যেন তছনছ হয়ে যায়। আমেনা তার চোখের সামনে। বউ হবার কথা থেকে চাচী হয়ে গেলো!

আমরা সাহিত্য চর্চাও করবো না, লেখকও তৈরি করবো না, সম্পাদনাও করবো না, কেবল প্রকাশ করবো স্বপ্ন আর সৌহার্দ্য।

আপনার লেখা আজেই পাঠিয়ে দিন শুভ্র কাগজে। এই কাগজ প্রকাশ করবে আপনার প্রীতি।