বিমূর্ত বিভ্রম

– নুসরাত জুবেরী –

১.
মানুষটাকে আলেয়া চেনে না।
মুখের একটা পাশ দেখা যাচ্ছে আর অন্য একপাশ পুরোপুরি অন্ধকার। এমন অবস্থায় পরিচিত কেউ হলেও চেনা দুষ্কর, আর এই ছেলেকে তো আলেয়া দেখছে গত দু’তিন দিন ধরে এবং প্রতিবার, এই একই ভাবে। সুপ্তাদের বাসার গেটের কাছে দুইদিন দেখেছে, আরেকদিন নিজেদের যে নতুন বাসার কন্সট্রাকশন এর কাজ চলছে তার একটা পিলার ধরে আড়াল হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছে। আলেয়া কে দেখেই পালিয়েছে চোখের নিমিষে; কিছু বুঝে উঠার আগেই। শেষ দিন দেখল আলেয়াদের বাড়ির পাশ দিয়ে যে নদীটা বয়ে গেছে, ছেলেটা সেই নদীর পাশে পড়ে থাকা একটা নষ্ট ট্রলারের পাটাতনের উপর বসে আছে। ওইদিন ও বুঝেনি হয়ত যে আলেয়া তার পেছনেই আছে, বুঝলে নিশ্চিত বরাবরের মত তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে থাকতো, এরপর চোখের নিমিষে উধাও হয়ে যেতো। আলেয়াও পেছন থেকে চলে এসেছিল নিঃশব্দে।

এসব দেখতে দেখতেই প্রচন্ড রকম অস্থিরতা নিয়ে আলেয়ার ঘুম ভাঙল। মাথার বা পাশে হাতুড়ের তীক্ষ্ণ পাশ দিয়ে করা আঘাতের মত অনুভূত হচ্ছে।
এতক্ষন ও স্বপ্ন দেখছিল। স্বপ্ন দেখে প্রায়ই এরকম একটা অস্বস্তিজনক কষ্টের পরিস্থিতি হয় আলেয়ার।

সকাল প্রায় ১০ টা বাজে। আগামীকাল প্র‍্যাক্টিকাল পরীক্ষা শুরু। এখনো কিছু পড়া শুরু করেনি আলেয়া। বিছানা ছেড়ে উঠে হাত মুখ ধুয়ে দুইটা বিস্কিট আর পানি খেয়ে বই নিয়ে বসেছে কেবল।
পড়ায় মনোযোগ নেই একদমি, মাথার একপাশে খুব সুক্ষ্ণ ভাবে নাড়া দিয়ে যাচ্ছে স্বপ্নটা। বিশেষ করে আলো আধারে খেলে যাওয়া মানুষটার একপাশি চেহারা। বাস্তবের কারও সাথে মিল খুঁজে পাচ্ছেনা। অস্বস্থি অস্থিরতা ক্রমেই বাড়ছে।

আলেয়ার ফোন বেজে উঠল। মা ফোন করেছে। মা আর আনিকা আপুর সাথে কথা বলে প্রায় বারোটা পার করল আলেয়া। এরপর আবার পড়তে বসল।
কিছুসময় পর আবার নাড়া দিয়ে উঠল এক প্রশ্ন- যদিও স্বপ্ন তো স্বপ্নই তারপরেও একটা মানুষের মুখ কিভাবে অর্ধেক ঢাকা হতে পারে! যদি মেয়ে হত তাহলে মেনে নেয়া যেতো কারন অনেক মেয়েরাই নিজেকে সুন্দর দেখানোর জন্য মুখের একপাশ চুল দিয়ে ঢেকে রাখে। স্বপ্ন নিয়ে এমন রহস্যের জালে ফেঁসে যাওয়াটা বিরক্তিকর আলেয়ার কাছে। দুপুর গড়িয়ে সময় বিকেলের দিকে যাচ্ছে, আলেয়ার মাথার বা দিকটা এখনো ভাড় হয়ে আছে। সাথে আবার ঘুম ঘুমও পাচ্ছে। সকাল থেকে আলেয়া মাত্র একটা টপিক পড়েছে। পঁচিশ মার্কের পরীক্ষা বলে হয়ত গায়ে লাগাচ্ছে না। হয়ে যাবে হয়ে যাবে বলে নিজেই নিজেকে বুঝাচ্ছে।

বিছানায় যেয়ে ঘুমানোর প্রস্তুতি নিল আলেয়া। আর বেশ খানিক সময় স্বপ্ন নিয়ে ভাবল। মনে কেমন এক অদ্ভুত সম্মোহনী শক্তির আবেশ স্বপ্নটা ঘিরে। সবাই বলে একটা জিনিস নিয়ে ভাবলে নাকি সেটা স্বপ্নে আসে। এই থিওরি আগেও বেশ কয়েকটা স্বপ্নের ক্ষেত্রে আলেয়া কাজে লাগিয়েছে এবং এটাও বুঝেছে যে স্বপ্ন নিয়ে ভাবলে সেটা আর স্বপ্নেই আসেনা।

আলেয়ার ঘুম ভাঙ্গল সন্ধ্যা ছয়টার পর। দুপুরের খাবার পর বিকেলের ঘুমটা কেমন যেন মাতাল করে তোলে। আলেয়া ঢুলে ঢুলে বাথরুমে যেয়ে ফ্রেশ হল। মাথার পাশের চিনচিন ব্যাথাটা এখনও আছে। আজ প্রচন্ড গরম, সাথে ঘুমানোর পর মাতাল অবস্থা আর চিনচিন ব্যাথা সব মিলিয়ে বিশ্রি একটা পরিস্থিতি। ফ্রেশ হতে হতে আলেয়ার মনে হল কাল রিপোর্ট সাবমিশন এর ডেড লাইন। কিন্তু এখনও কিছু কাজ বাকি আছে। আলেয়া তাড়াহুড়ো করে কাজ শেষ করে সাড়ে সাতটার দিকে হলের নিচে ফটোকপির দোকানে গেল। ভিড় থাকায় পাশে কিছুক্ষন বসতে হল। মনে হচ্ছে ঘুমে হয়ত টুল থেকে ঠাস করে পড়ে যাবে ও। তারপর দোকানের ভিতরের বাকি সবাই হো হো করে হেসে উঠবে, দু’একজন হয়ত হাত বাড়িয়ে দিবে আলেয়াকে তুলতে।

হঠাৎ মাথার ভিতরে তক্ষক ডেকে উঠল। না, এটা মাথার ভিতরে না। বাস্তবেই ডাকছে। এই হলে বেশ কয়েকটা তক্ষক আছে, মাঝেমধ্যেই ডাকে বিশেষ করে সন্ধ্যা রাতে। আলেয়া মাত্র কিছুদিন আগেই জেনেছে যে গুইসাপ আর তক্ষকের মধ্যে পার্থক্য আছে। ড্রাগস এর বাজারে একটা তক্ষক এর মূল্য অনেক বেশি, এর শরীরের বিষ থেকে মহামূল্যবান প্রতিষেধক তৈরি হয়। আর গুইসাপ হল সেই প্রানী যার কাছে গেলে এরা মানুষের শরীরে থুতু দেয়। এরপর সেই স্থান পচেঁ যায়।

ফটোকপি দোকানের ভিড়টা একটু কমে এসেছে। দোকানের আশিক ভাই কে প্রিন্ট আউটের কাজটা বুঝিয়ে দিয়ে আলেয়া বাহিরে এসে দাঁড়ালো। ভাবছে, হলের দক্ষিণপাশ দিয়ে একটু হেঁটে আসবে কিনা। পরক্ষনেই মনে হলো, না থাক। এই পাশটা ঘুটঘুটে অন্ধকার। হলের এই দিকে হাঁটতে থাকলে পেছনে যেয়ে লেকের সাথে একটা ঘাট বাঁধানো জায়গা আছে- অনেক পুরানো, স্যাঁতস্যাঁতে আর কিছুটা ভৌতিকও। ত্রপারা গিয়েছিল। আলেয়া গল্প শুনেছে। হলের উত্তর পাশের দোতলায় যাদের রুম তারাও নাকি ওইখান থেকে অদ্ভুত ভুতুড়ে আওয়াজ পায়। এরপর কল্পনা করতে করতেই এই না দেখা ঘাট নিয়ে আলেয়া পরপর কয়েকদিন বীভৎস কিছু মরাপঁচা ধরনের স্বপ্ন দেখেছে। তারপর আর যাওয়ার ইচ্ছাই হয়নি কখনো ।

২.
রাত প্রায় অনেক হয়েছে। এই এক্সামের সময়েও রাত দুইটা তিনটার আগে ঘুমাতে পারেনা আলেয়া; আসলে ঘুম আসেনা। অনেক চেষ্টার পর ঘুম না আসায় আলেয়া রুম থেকে বের হয়ে হলের করিডোরে কিছুক্ষণ দাঁড়ালো।
বেশ সুন্দর চাঁদ উঠেছে আর হালকা মৃদু একটা বাতাস বইছে। সারাদিনের ঘর্মাক্ত অবস্থা শেষে এই প্রথম মনে হয় আলেয়া বুক ভরে নিঃশ্বাস নিল। হল মাঠের চারতলার বিল্ডিং ছাড়িয়ে বেড়ে উঠা ক্রিস্মাস ট্রির আরালে, দেয়ালের কার্নিশ ঘেষে এখনও চাঁদ দেখা যাচ্ছে।
চাঁদের দিকে তাকিয়েই আলেয়ার মনে হল দুইদিন আগে চাঁদটা অর্ধচন্দ্রাকার অবস্থায় ছিল। অর্ধচন্দ্রাকৃতি থেকে মনে পড়ে গেল আবার সেই স্বপ্নের কথা। আলেয়া অনেকদিন থেকেই ভাবছিল একটা বই কিনবে স্বপ্নের ব্যাখার সম্পর্কিত। কেনা হয়ে উঠেনি। এইবার এক্সাম শেষ করেই নীলক্ষেতে খুঁজবে খোয়াবনামা সম্পর্কিত বই।

এখন প্রায় নিশুতি রাত। আলেয়া বসে আছে। বসে বসে আকাশ দেখছে। ছোট বয়সে আলেয়ার আকাশ দেখার অভ্যাস ছিল খুব। তখন আকাশ দেখতে ভাল লাগতো। পূর্ণিমার রাত গুলোতে আলেয়া ডায়েরীতে লিখত। ডায়েরীর পাতাগুলোতে তখন রাত বাড়ার সাথে সাথে গোলাকার চাঁদের অবস্থানের বিবরণ দেয়া থাকত- এখন আকাশের চাঁদটা নারিকেল গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে উঁকি দিচ্ছে।
রাত দুইটা পাঁচ; এখন চাঁদ নারিকেল গাছের লম্বা ডাল টার একদম মাথায় আছে। চাঁদটার পাশে দু’টুকরো মেঘ ভাসছে। এটা হয়ত একটু পর চাঁদকে ঢেকে দিবে। এরকম আরও কত কি যে লিখত!

আলেয়া রুমে আসলো। বিছানার পাশে জানালা থেকে চাঁদ দেখা যায়। পাম গাছের মাথায় চাঁদ হাসে। আচ্ছা! চাঁদ কে সবাই হাসিতেই কেন ভাবে!! আকাশ কি শুধু খুশি থাকলেই চাঁদ হাসে? রেগে যায় বলে সূর্য দেয়, বেশি রাগলে ঝড়……

৩.
হল গেটে রিকশা নিয়ে বসে আছে আলেয়া। আভা এখনো আসছে না। প্রায় সাতমিনিট লেট। গরমে সবার মেজাজ খারাপ, রিকশাওয়ালা মামাদের ও।

-“খালা না গেলে রিকশা ছাইড়া দেন। এতক্ষণে আমার দুইটা খ্যাপ হইয়া যাইত। আর আপনে বসায়া রাখছেন”।

ক্যাম্পাসের প্রথমদিকের কথা, হলে উঠেছে মাত্র চার পাচঁদিন হবে। সকাল সাড়ে আটটার ক্লাসের জন্য আলেয়া ঘুম থেকে উঠতো সোয়া সাতটা বাজে। আর আভা ছয়টা বাজে উঠে ঢুলে ঢুলে পড়তে বসত। আভা সবার আগে রেডি হওয়া শুরু করলেও ঢুলতে ঢুলতে বের হত সবার পরে। একদিন বিরক্ত হয়ে আলেয়া ওদের কে রেখে একা একা ডিপার্টমেন্ট এ চলে গিয়েছিল। রেডি হয়ে এতো বসে থাকা যায় নাকি! আর মানুষ এত ঢিলা কিভাবে হয়!
তখন আরেকজন ছিল ওদের সাথে- সিথী। সিথী এখনো আছে কিন্তু আগের মত নেই। ও আভার মত এত বেশি ঢিলা না হলেও, দুজনেই লেট লেডি ছিল। টু বিউটিফুল চিরিং লেট লেডি!!!

৪.
একটা দুইটা করে এক্সামগুলো শেষ হয়েই গেল। পুরো দুইটা মাস কি চাপের মাঝেই না ছিল আলেয়া আর এক্সাম পূর্ববর্তী ডিপার্টমেন্টাল প্রেসার এখন মনে হলেই অস্থির লাগে। সব মিলিয়ে ধরতে গেলে আজ প্রায় ছয় মাস পর মনে হয় পড়াশুনা বিহীন একটা বড় নিশ্বাস নেওয়ার সময় হল।

এক্সামের শেষ করে আলেয়া প্রতিদিনি জয় এর সাথে দুপুরের খাবারটা বাইরে খায়। আজকে জয়কে ফোন করে পাওয়া গেলনা। গতদিনও এমন হয়েছিল। আলেয়া মেজাজ খারাপ করে হলে চলে আসল। হল গেটে এসেই ত্রপার দেখা, ও ফটোকপি এর দোকান থেকে বের হচ্ছে। এরপর ত্রপার সাথে বসেই ক্যান্টিনে দুপুরের খাবারটা খেয়ে নিল। ত্রপার সাথে কিছুক্ষন গল্প করে রুমে এসে শরীর এলিয়ে দিল বিছানায়। অসহনীয় গরম, মেজাজ খারাপের কোন কারন না থাকলেও মেজাজটা খিটখিটে হয়ে থাকে। আজ থেকে আলেয়ার উপন্যাস আর গল্পের বই পড়ার দিন শুরু। পরীক্ষার মধ্যে রকমারি থেকে তিন চারটা নতুন বই অর্ডার করে রেখেছিল। সেখান থেকে নিক পিরোগের ত্রি এ.এম সিরিজের একটা বই হাতে নিয়ে ফেসবুক হোমপেজ স্ক্রল করতে করতে আলেয়া তার বিকেলের ঘুমের অতল গভীরে তলিয়ে গেল।

৫.
আলেয়ার পড়ার টেবিলের সাথে চেয়ারটা একটু নড়বরে। কেউ একজন বসে নড়াচড়া করলে অনেকটা রকিং চেয়ারের মতই লাগে। সেইখানে একজন বসে আছে। ঘুটঘুটে অন্ধকারেই তার মুখের অর্ধেক পাশটা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ঘোর অন্ধকারের মাঝে একটা মোমের আলোর ওপাশে কারও চেহারা রাখলে যেমন হলুদাভ একটা আভা ছুঁয়ে যায় চোখে মুখে, ঠিক তেমনভাবেই আলো ছুঁয়ে গেছে এই মুখটায়। মাথা থেকে সমস্ত শরীরে জড়িয়ে রেখেছে একটা কালো রঙের খাদি চাদর। চাদরে ঢেকে মুখের একটা পাশ আরাল হয়ে গেছে। কালো চাদর আর অন্ধকার এ মিশে মনে হচ্ছে ছেলেটার মুখের একটা অংশ সত্যি নেই।

এক জোড়া কৌতুহলি চোখ অপলক দৃষ্টিতে উবু হয়ে তাকিয়ে আছে ওর দিকে। আলেয়াও চোখ ফেরাতে পারছেনা।
একসময় কেমন যেন কৌতুহলী থেকে চোখেমুখে একটা হিংস্র কিন্তু তারপরেও অকৃত্রিম মায়া জড়ানো একটা ছাপ চলে আসতে লাগল। দেখে হু হু করে বুক কেঁপে উঠে কিন্ত চোখ সরাতে ইচ্ছা হয়না।

আলেয়া ঘুমের মাঝেই বুঝতে পারল ওর শরীরটা নড়ছে। অনেকসময় দম আটকে রাখার পর হাফ ছাড়ার মত নিঃশ্বাস টেনে আলেয়া জেগে উঠল।

-“কিরে! সেই কখন থেকে তোকে ডাকছি তোর কোন সাড়াই পাচ্ছিনা। চোখ মুখের এই অবস্থা কেন? ভূত দেখলি নাকি ঘুমের মধ্যে”? এটা বলে ত্রপা নিজেই ঠাকুমারঝুলির ভূতেদের মত হি হি করে হেসে দেখাল।
-“ঘুমের মধ্যে নিশ্বাস আটকে যায় মাঝে মাঝে। তখন এমন হয়। আলোটা জ্বালাতো আমার পাশের”।
-“লাইট জ্বালিয়ে রুমের জানালা গুলো আটকাতে আটকাতে ত্রপা বলল, ক্যান্টিনে আজকে প্যাকেজ খাবার দিছে- পোলাও মুরগি খাসি আর সালাদ সত্তুর টাকা। তুই কি খাইতে যাবি নাকি তোর জন্য ভাত তরকারি এনে দিব”?
-“মাথাটা ধরছে আমার। হুট করে ঘুম ভাংছে তো, তুই খাবারটা নিয়ে আয়। রুমে খাব আমি”।
-“আচ্ছা”।

ত্রপা গুনগুন করতে করতে চলে গেল রুম থেকে। আলেয়ার মাথাটা চিঞ্চিন ব্যাথা করছে বাপাশে। গত কয়েকদিনের এক্সামের মাঝে প্রায় এক সপ্তাহ আগেকার দেখা সেই স্বপ্নের কথা প্রায় ভুলেই গেছিল আলেয়া।

বিছানা থেকে উঠে গিয়ে নিজের চেয়ারটায় গিয়ে বসল আলেয়া। অন্ধকারে দেখা মুখের আদলটার সাথে পরিচিত কারো মিল আছে কিনা ভাবতে লাগল।
নাহ!! এমনতো কেউ নেই। এই চেহারা কাওকে কখনই দেখেনি ও।

রাত প্রায় দশটা বাজতে গেল। আলেয়ার বরাবরই রাতে গোসলের অবভ্যাস। হাতে তোয়ালা নিয়ে ও গোসলের জন্য গেলো, সাথে নিজের মোবাইল ফোন। গোসলের সময় আরও বেশি রিল্যাক্সেশনের জন্য আলেয়া এই হলের গোসলখানাও মোবাইল নিয়ে যায়। মোবাইলে গান প্লে করে সেটাকে তোয়ালার ভিতর ঢুকিয়ে রাখে এবং এই সময় মোবাইল টা এরোপ্লেন মুডে নিয়ে রাখে। যে কোন রকম বাইভ্রেশন এ ফোনটা যাতে পরে না যায়। প্রথম প্রথম সবাই খুউবি অবাক হত যে গোসলখানায় গান কেন বাজে, কেউ কি ভুল করে মোবাইল রেখে গেছে কিনা! এইতো গত শীতের প্রথমদিককার ঘটনা-
ও গান শুনতে শুনতে গোসল করছে; রাত প্রায় একটা বাজে। গোসল শেষের দিকে। ও বের হবে এমন সময় ওয়াশরুম এ একটা মেয়ে ঢুকল। ও বের হয়ে দেখল পাশের রুমের জুনিয়র কাকলি। কাকলি কে দেখেই আলেয়া মিষ্টি করে একটা হাসি দিল। ওইদিকে কাকলি ওর দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে; আলেয়া ওকে বলতে যাবে কি খবর কাকলি- তখনি একটা দৌড় দিল এবং বাথরুমের ময়লা ফ্লোরে ঠাস করে একটা আছাড় খেল। হা হা হা! কত কত আজব চরিত্রের আজব ঘটনা অহরহ ঘটতে থাকে এই একটি জায়গার মাঝেই!!!!

গোসলের পর আলেয়া রাতের খাবার খেয়ে কিছুক্ষণ কল্ল্যানীর রুমে যেয়ে গল্প গুজব করল। আভা এক্সাম দিয়েই চিৎপটাং মেরে গেছে। প্রতিবছর এই সময়টাতেই মেয়েটা অসুস্থ হয়। ও অসুস্থ হলেই আলেয়া বলে তুই তো মনে হয় আর বেশিদিন টিকবিনা। কম ঘুমা, কিছু কর, শিখ কিছু। অন্তত সাইক্লিং টা শিখে নে। তাহলে মরলে পরে মাঝে মাঝে মুনকিরনাকির সহ কবর থেকে কিছুক্ষণের জন্য পালিয়ে যেতে পারবি- বলে নিজেই হো হো করে হাসতে থাকে।
আভা তখন মজা করে বলে, কেন তুই এভাবে বলিস আমাকে? আমি আমার আম্মুকে বলে দিব, তখন আম্মু এসে তোকে মারবে।
যদিও আলেয়ার সত্যি সত্যিই মনে হয় যে আভা বেশিদিন বাঁঁচবেনা। একসাথে থাকা অবস্থাতেই একদিন পটাশ করে মরে যাবে।

৬.
সুপ্তা ওদের বাড়ির গেটের সামনের গোলাপ গাছটার পাশে দাঁড়িয়ে আছে। সামনে আরো একজন আছে যার সাথে সুপ্তা খুব চিকন স্বরে কথা বলছে। আলেয়াকে দেখা মাত্রই সুপ্তা ওকে হাত নেড়ে কাছে ডাকল। আলেয়া মুখে হালকা হাসি এনে এগিয়ে গেল। ও যখন সুপ্তা আর অন্য একজনের পাঁচহাতের মধ্যে, তখন সেই একজন মুখ ঘুরিয়ে আলেয়ার দিকে তাকিয়ে ছোট করে অপরিচিত ভঙ্গিতে হাসি দিল একটা, এরপর মুখ ঘুরিয়ে নিল।

সাথে সাথে আলেয়া থমকে দাঁড়িয়ে গেল; ওর মুখ থেকে অস্ফুট স্বরে বের হল- সেই মানুষটা! এবং ঠিক আগের মতই। শুধু একপাশ দেখা যায়। ওর সাথে সুপ্তা কি কথা বলছে! আলেয়া মুখ তুলে আরেকবার ভালভাবে তাকানোর সময় দেখল মানুষটা ভয়ংকর একজোড়া চোখে আলেয়ার দিকে তাকিয়ে খুব ছোট ছোট এবং আস্তে আস্তে বড় বড় পা ফেলে চোখের নিমিষে উধাও হয়ে গেল। কিছু বুঝে উঠার আগেই দেখল সাথে সুপ্তাও নেই।

একইভাবে, আলেয়া আবার সেই স্বপ্ন দেখছিল। এই দিয়ে তিনবার একটা অস্পষ্ট মুখ, একইভাবে। কেন!

মাঝে মাঝে এমন বিচ্ছিরি ঘুম হয় যে কখন কিভাবে ঘুমিয়েছে বা ঘুমের আগে কি করছিল কিচ্ছু মাথায় থাকেনা। একটা ঘোরের মত লাগে সবকিছু। আলেয়ার ঘাড়ের ডানপাশ টা ব্যাথায় ফুলে উঠেছে। অতিরিক্ত স্ট্রেস বা উল্টাপাল্টা ঘুমের পজিসনের কারনে এমন হয়।
সুপ্তার কথা মনে হল আলেয়ার। সুপ্তা ওর কলেজ ফ্রেন্ড। আজকে স্বপ্নে সুপ্তা ছিল, সুপ্তাদের হলুদ রঙের বাড়িটাও ছিল। কিন্তু সুপ্তাদের গেটে কোন গোলাপ ফুলের গাছ নেই। পাহাড়ায় দুইটা বড় কামেনী ফুলের গাছ আছে।

আলেয়া আর কিছু ভাবতে পারছেনা। ফোনটা হাতে নিয়ে সময় দেখল। কখন ঘুমিয়েছিল মনে পরছেনা।
প্রায় আড়াইটা বাজে, তার মানে আরেকটা দিন শুরু হয়ে গেছে। আজ আলেয়া চিটাগাং যাবে। আনিকা আপুর বাসায়। তিন নাম্বার এক্সামের দিন আনিকা আপুর মেয়ে হয়েছে। পরীক্ষার জন্য বাসার সবাই থাকলেও ও যেতে পারেনি। এক্সামের মাঝেই সময় করে বাবুর জন্য একটা সাদা রঙের জামা কিনে রেখেছে ও। ইচ্ছা ছিল সোনার টিপ পড়িয়ে প্রথম বাবুকে দেখবে কিন্তু সময়ের অভাবে সোনার টিপ বানানো হয়নি।
আলেয়া বাচ্চাকাচ্চা পছন্দ করেনা তেমন একটা। কিন্তু এই ছোট্ট শিশুটার ছবি দেখলে বুকে কেমন যেন একটা ভালবাসা তাড়া করে বেড়ায়। হয়ত নিজেদের বলেই এমন অনুভূতি হয়!

আলেয়ার ইচ্ছা করছে বিছানা থেকে নেমে করিডোর দিয়ে একটু হাঁটাহাঁটি করে আসতে। আবার আলসেমি ও লাগছে। আজ দুবার এই স্বপ্ন দেখে এখন কিছুটা ভয় ভয় ও করছে। আর সকাল সাতটা বা তার আগেই ওকে রওনা করতে হবে নাহলে দেড়ি হয়ে যাবে অনেক। জ্যামে পড়লে ঢাকা পার করতে করতেই একটা বেজে যাবে।

৭.
আলেয়া দাঁড়িয়ে আছে এখন সায়েদাবাদে। দোকান থেকে একটা পাঁচশ মিলি পানির বোতল কিনে বাসের পাশে দাঁড়িয়ে আছে। মিনিবাসে করে গাবতলী থেকে পুরো ঢাকা ঘুরে সায়েদাবাদ আসতেই বারোটা বেজে গেছে। সূর্য একদম মাথার উপরে। গাড়িতে উঠে নিজের সিটটা একবার দেখে নিয়েছে। বরাবরের মতই, আলেয়া যেইদিকে বসবে সূর্য সেইদিকেই থাকবে। আলেয়া মনে মনে বজ্জাত কচু বালছাল বলে গালি দিল কয়েকবার। সূর্যকে দিল নাকি নিজের সিট ভাগ্যকে কে জানে!
বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর থেকে দূরে জার্নি করতে করতে বাসের মধ্যে ঘুমানোর অবভ্যাস টা বেশ পোক্ত করেছে আলেয়া। এখন লোকাল বাসের পাঁচ সাত মিনিটের জার্নিতেও দিব্যি ঘুমিয়ে নিতে পারে।

রোদের ভাব টা খুব কড়াভাবে মুখে পড়তেই আলেয়া জেগে উঠল। ঘুমের চিন্তা করতে করতেই ঘুমিয়ে পড়েছিল সে। বাসের জানালা দিয়ে বাইরে তাকাতেই আশেপাশের রাস্তাঘাট দেখে বুঝল যে চিটাগাং এর ভেতরে ঢুকে গেছে। তারমানে পাক্কা চার ঘন্টার মত ঘুম হইছে। এখন ও আছে মিরসরাই এ। এই রাস্তাঘাটগুলোতে অসম্ভব ভাল লাগা আছে। বিশুদ্ধ অক্সিজেন নেয়া যায়। আর মিরসরাই; মিরসরাই নামটাও কি সুন্দর তাইনা! যেমন- বাইরের দেশগুলোতে বলে কাশ্মির, লাদাখ, দার্জিলিং অনেকটা ওইরকম।

আলেয়ার দেড়বছর আগের কথা মনে পড়ে গেল। আনিকা আপুর বিয়ের সময়ের কথা। রাত এগারোটায় কমলাপুর থেকে ট্রেনে উঠেছিল ওরা তিনজন- ত্রপা, জিসান আর ও। ওই প্রথম ট্রেন জার্নি করে খুব ভাল লেগেছিল আলেয়ার। জিসান ছিল খুউব ভ্রমনরসিক। রাতভর ট্রেনের ইঞ্জিনের ঝমঝম শব্দ আর জিসানের একেকটা এডভেঞ্চারাস ট্র‍্যাকিং এর গল্প শুনতে শুনতে কখন সীতাকুন্ডের ভোর দেখল; খেয়ালই ছিল না। আনিকা আপুর বিয়ের সময় আলেয়ার বন্ধুমহল থেকে এই দুইজন ছাড়া আর কেউ তেমন আসেনি। নানান রকম ব্যস্ততায় সকলে জীবনটা অনিচ্ছাকৃত ভাবে বাধা। বিয়ের আগের দিন অবশ্য নিপুণ আর তিশা এসেছিল। এছাড়া ঢাকা থেকে চিটাগাং এসে বান্ধবীর বোনের বিয়ের দাওয়াত খাওয়ার কোনো মানে হয়না, বান্ধবীর নিজের বিয়ে হলেও একটা কথা!
সময় কত দ্রুত চলে যায়। এইতো সেদিনই বিয়ে হল। কত নাচানাচি, গান-বাজনা, হই-হুল্লোর। দেখতে দেখতে বছর পার হয়ে গেল।

৮.
এই প্রথমবার আলেয়া কোলে তুলে নিল বাচ্চাটাকে। ওর একটা নাম দিয়েছিল আলেয়া; লিলি। আনিকা আপুকে বলতো, আমি জানি এটা অনেক ব্যাকডেটেড নাম কিন্তু আমি লিলিই বলবো, আর মাঝে মাঝে ছোটো করে লিল। লিলি পেটে থাকা অবস্থায় আলেয়া একটা কবিতা লিখেছিল ওকে নিয়ে-

অতঃপর সে লিলির মুখখানি দেখিল,
কোলে তুলিয়া নিলো যেন এক জীবন্ত পুতুল!
শরীরের পলকা চামড়ার নিচে-
এখনো ভাসিয়া উঠিতেছে সবুজাভ শিরা-উপশিরা,
পুরো শরীরটাই যেন,
কুসুম রঙা এক থোকা টিউলিপের ফুল।
স্তভিত করা স্বর্গোদ্যানের কোন মায়া জাগরণী
শিহরিত করিয়া তুলে চোখের পাতা;
অপলক চাইয়া থাকে আসমানি!

সত্যি অপলক ভাবে তাকিয়ে আছে আলেয়া। ছোট শিশুদের মধ্যে যে নিষ্পাপ একটা ঘ্রাণ থাকে এই ঘ্রাণ টা যেন নিজের ভেতরের সব দূষিতকেও ধুয়ে বিশুদ্ধ করে দেয়। ওদের চোখের সাথে একটা দৃষ্টির মিল যেন হাজারটা কোল্ড আইমাস্ক থেরাপির থেকেও বেশি প্রশান্তি দেয়।

৯.
গতকাল রাত থেকে টানা বৃষ্টির। এখনো একনাগাড়ে বৃষ্টি হচ্ছে। এর মধ্যেই বাসা থেকে বের হয়ে গেল আলেয়া। বাসার নিচে পনেরো মিনিট দাঁড়িয়ে থেকে একটা সিএনজি পেলো। উদ্দ্যেশ্য বাতিঘর লাইব্রেরীতে যাবে। অনেক নাম শুনেছে অথচ চিটাগাং এসে এখন পর্যন্ত যাওয়া হয়নি তাই আজ একাই বের হয়ে গেলো।
বাতিঘর লাইব্রেরীর ভেতরে কোণার দিকের একটা নিরিবিলি জায়গায় গিয়ে আলেয়া বসে পড়লো। মৃদু আলো এইখানে। বইয়ের অক্ষরগুলো বুঝার জন্য যথেষ্ট এমন। বৃষ্টির জন্য আজ মনে হয় মানুষের আনাগোনা এমনিও কম। আলেয়া প্রথমে স্বপ্ন সম্পর্কিত বই খুঁজলো। পেলোনা। না পেয়ে কাওকে জিজ্ঞেস করলোনা যে লাইব্রেরিতে এই সম্পর্কিত কোনো বই আছে কিনা। হাতের নাগালে পাওয়া একটা বই নিয়ে আবার নিজের জায়গায় এসে বসলো। ‘ফিংগার পয়েন্টিং টু দ্যা মুন’- অথোরড বাই অশো।
বাহ! নামটা বেশ সুন্দর তো। নামটা পড়লেই মাথায় ভেতরে চিত্র ভেসে উঠে- কেউ একজন আঙ্গুলটা তাক করে ঢেকে ফেলেছে চাঁদকে।
চাঁদ চাঁদ চাঁদ!!!
পূর্ণিমা পূর্ণিমা!!!
আঙ্গুল আঙ্গুল আঙ্গুল!!!

বইয়ের পেজ উল্টাতে উল্টাতে আলেয়া শব্দগুলো বিড়বিড় করছে। সামনের সায়েন্স ফিকশন রো- এর কোণায় বসে আছে একজন। পিঠ দুলিয়ে দুলিয়ে বই পড়ছে। ভাবটা এমন যেন রোকিং চেয়ারে বসে আছে। শরীরে খয়েরি রংয়ের চাদর জড়ানো। বৃষ্টিতে চুপচুপ হয়ে ভিঁজে কোথাও দাঁড়ানোর জায়গা না পেয়ে হয়তো লাইব্রেরীতে ঢুকেছে। গাঁয়ের চাদর দিয়ে বর্ষাকালেই শীত নামিয়ে এনেছে এই ছেলে।
এইসময় মানুষটা আলেয়ার দিকে এক পলকের জন্য তাকিয়ে চোখ ফিরিয়ে নিলো; যেনো আলেয়া এতক্ষণ মনে মনে কি বলেছে তার সবটাই সে শুনতে পেয়েছে। আলেয়ার শরীরের প্রতিটি অংশ ছুঁয়ে যেন একটা ভয়মাখা হিমশিতল বাতাস বয়ে গেল। আলেয়া ঘামছে।

কয়েকমূহূর্ত পর আলেয়া একটু ধাতস্থ হলো। মানুষটা এখনো দুলে দুলে পড়ছে। আলেয়া ভাবলো বই খোঁজার ভাণ করে সামনের দিকে এগিয়ে যাবে। একটা দীর্ঘশ্বাস নিয়ে সে তাই করলো। আলেয়া আড়চোখে তাকাচ্ছে আর হাত দিয়ে বই নাড়াচাড়া করছে।

-“কোনো স্পেসিফিক বই খুঁজছেন আপনি”?
(আলেয়া এইবার তার স্বাভাবিক গলা শুনে নিজেও যেন একটু স্বাভাবিক হলো। ভয় লাগছেনা। এখন মনে হচ্ছে একটা মানুষের চেহারার একপাশ দৃশ্যমান আর অন্যপাশ রহস্যের মত ধূসর অন্ধকার হবে; এটাই যেন স্বাভাবিক।)

– “না। একটু করে পড়ে দেখছিলাম। ভালো লাগলে কিনবো”।
– “আমি লাইব্রেরিয়ান। আপনি চাইলে আমি কিছু বই সাজেস্ট করতে পারি”।
– “অবশ্যই। তাহলে তো আমার জন্য ভালো হয়”।

মানুষটা ঘুরে ঘুরে আলেয়ার হাতে পাঁচ থেকে ছয়টা বই দিলো। এইসময় আলেয়া জিগেস করলো,
– “এইসময়ে আপনি গরম চাদর কেন পড়ে আছেন”?
– “লাইব্রেরীর সার্বক্ষণিক এসির বাতাসটা শরীরে পড়লে ভাল লাগেনা। নিজেকে মর্গের একটা লাশ মনে হয়। তাই…”
– “আপনার নাম”?
– “হাতে শেষ বইটা দিয়ে যেতে যেতে মানুষটা বললো, দেখা হলে বলবো”।

হাতে রাখা শেষ বইটি দেখে আলেয়া ছোটোখাটো ধাক্কা খেলো। কালো রংয়ের মলাটে গোটা গোটা লাল অক্ষরে লেখা- “মাই বিউটিফুল ইলিউশান অফ ডেথ”।

১০.
রাত প্রায় তিনটা বাজতে যাচ্ছে। আলেয়া বারান্দার রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে আছে। ভেতরে লিলি কাঁদছে। আনিকা আপু ওকে সামলাতে ব্যস্ত। লাইব্রেরী থেকে ফেরার পর আলেয়া প্যাকেট গুলো খুলেও দেখেনি এখনপর্যন্ত। অন্য সময় হলে প্যাকেট খুলে বইগুলো বুকে জড়িয়ে, নাক ডুবিয়ে ঘ্রাণ নিতো প্রতিটা ভাঁজের। এইবার মনে হচ্ছে ব্যাগ খুললেই দেখবে কোনো প্যাকেট নেই, বা প্যাকেট খুলে দেখবে সেই বইগুলো নেই। হয়তো ও আজ বাতিঘরেই যায়নি। সারাদিন ঘুমিয়েছে, ঘুমের মধ্যেই সব স্বপ্ন দেখেছে। মানুষের জীবনে কিছু কিছু বাস্তব এতটাই অপ্রত্যাশিত যে তাকে স্বপ্নের মত লাগে, আবার কিছু কিছু স্বপ্ন এতটাই বহমান আর তাজা যে তাকে লাগে বাস্তবের মত।

– “এটাকে বলে কাল্পনিক বাস্তব। আপনি এতটাই গভীরতা দিয়ে কল্পনা করতে পারছেন যে সেটা আপনার সামনে বাস্তব বলে ধরা দিচ্ছে”।

আলেয়া থমকে দাঁড়ালো।
-“মানে! মানে কি? আপনি”?
-“আমি কল্পনা”।
-“আপনি লাইব্রেরিয়ান”!
-“ওটাও কল্পনা”।

আলেয়া দরজা খুলে ভেতরে ঢুকে ব্যাগ থেকে বইয়ের প্যাকেটটা একটানে ছিড়ে বইগুলো দেখলো। সবগুলো বই আছে। আবার দৌড়ে বারান্দায় গেল। ভাগ্যিস আনিকা আপু রুমে নেই। লিলিকে নিয়ে ড্রয়িংরুমে হাঁটছে হয়তো। নাহলে ওকে এভাবে হাঁপাতে দেখলে প্রশ্ন করতো। মানুষটা এখনো রেলিং ধরে ঠাঁই দাঁড়িয়ে আছে। আলেয়ার দিকে তাকিয়ে বেঈমানি ভঙ্গিতে হাসছে।

– “বইগুলো সবই আছে”।
-“বইগুলো আপনি নিজ হাতেই তুলেছেন”।
– “তাহলে আপনি কে”?
– “ওইযে বললাম, বাস্তবিক কল্পনা বা কাল্পনিক বাস্তব। অথবা, দি বিউটুফুল ইলিউশান অফ ডেথ”।
– “এটার মানে কি”?
– “এইযে ধরেন, আপনার হাতটা যদি আমি এখন রেলিং থেকে ছাড়িয়ে নেই, তারপর সজোরে ধাক্কা দিয়ে আপনাকে এই সেভেনথ ফ্লোর থেকে নিচে ফেলে দেই- তাহলে আমিই হয়ে যাবো আপনার বিউটিফুল ইলিউশান অফ ডেথ।
হা! হা! হা! হা! হা!”

ভয় পাবেন না। লাইফ এবং ডেথ মুদ্রার দুইপাশ। দুইটা পাশই সুন্দর। একপাশ আলোর বলে দেখা যায়, অন্যপাশ অন্ধকারে ডুবে থাকে; খুঁজে নিতে হয়।

আমরা সাহিত্য চর্চাও করবো না, লেখকও তৈরি করবো না, সম্পাদনাও করবো না, কেবল প্রকাশ করবো স্বপ্ন আর সৌহার্দ্য।

আপনার লেখা আজেই পাঠিয়ে দিন শুভ্র কাগজে। এই কাগজ প্রকাশ করবে আপনার প্রীতি।