যাত্রা বিরতি- ১

লিখেছেন
হাসান ইনাম

আকাশে সূর্য। টনটনে রোদ। রোদে অবশ্য তেমন তাপ নেই। ঝিরঝির বাতাসে পাল উড়ছে। রহমাতুল্লাহ পাটাতনে বসে তাকিয়ে আছে ছেড়ে আসা ঘাটের দিকে। বাদামতলী ঘাট অস্পষ্ট হয়ে গেছে অনেক আগেই। ওলন্দাজ কুটিরের টিনের চাল ঝলমল করছে রোদে। ধীরে ধীরে চালটাও দূরে চলে যাচ্ছে। রাহমাতুল্লাহ এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। পলক নড়ছে না চোখের পাতার। ঘাট, শ’তিনেক বাড়িঘর, রাস্তা,পুল, হাজার মানুষ সবকিছু ডিঙিয়ে রহমাতুল্লাহ যেন দেখতে পাচ্ছে নিজের বাড়ি। কাচারি ঘর পার হয়ে বৈঠকখানা। বৈঠকখানার উল্টোপাশে অন্দরমহলের দরজা। রহমাতুল্লাহর চোখে ভেসে উঠছে দরজায় শাড়ির আঁচল দাঁতে চেপে দাঁড়িয়ে থাকা রুখসানার অর্ধমুখচ্ছবি। ডান চোখের কাজল লেপ্টে গেছে। লেপ্টানো কাজলে চোখের জল মিলেমিশে অদ্ভুত একটা রং সৃষ্টি করেছে। সেই রং এ রঙিন হচ্ছে চোয়ালের তিল। রুখসানা শক্ত করে ধরে আছে পর্দার কাপড়। চিকচিক করে ছিঁড়ে যাচ্ছে পর্দা। রহমাতুল্লাহ পর্দা ছেড়ার আওয়াজও শুনতে পাচ্ছে।
আজ রহমাতুল্লাহর বিয়ের দশম দিন। রাত গড়ালে হবে এগারোতম রাত। কাঁচামালের একটা চালান পৌঁছে দেওয়া লাগবে খুলনায়। সাহেবদের কাজ। সময়ের হেরফের করা সম্ভব না। দাঁতে দাঁত চেপে রুখসানার কপালে চুমু খেয়ে বেরিয়ে পড়েছে রহমাতুল্লাহ। এইসব ছোটো খাটো চালানে অবশ্য না গেলেও হয়। এই প্রথম এত ছোট চালানে যাচ্ছে সে। এতদিন এসব চালানে যেতো বাকীবিল্লাহ। বাকীবিল্লাহ রহমাতুল্লাহর ছোট ভাই। গেলো ভাদ্র মাসে হঠাৎ এক দুপুরের পর মারা গেলো। দিব্যি সুস্থ ছেলেটা। ডাক্তার মৃতদেহ পরীক্ষা করে বলেছিলো অতিরিক্ত আফিম খাওয়ার জন্য এমন হয়েছে। রহমাতুল্লাহ বিশ্বাস করেনি। বাকীর ওসব দোষ ছিলো না। তবে ব্যবসাপাতি করতে গিয়ে ইউরোপিয়ান বন্ধু জুটিয়েছিলো কিছু। ওদের সাথে আড্ডা দেওয়ার সময়ও পেতে না তেমন। ঢাকায় থাকতো বছরের ভিতর মাত্র এক দুই মাস।
কোম্পানি আসার পর থেকে এ অঞ্চলের ব্যবসাপাতি সব শেষ। মোঘলদের শেষ সময় থেকেই সমস্যার শুরু। কোম্পানি এসে সব নিজেরা কব্জা করে নিয়েছে। ঢাকার ব্যবসায়ী পরিবারগুলো একে একে চলে গেছে ভারতবর্ষের বিভিন্ন রাজ্যে। দু একটা পরিবার যারা থেকে গেছে তাদের অবস্থাও তেমন সুবিধাজনক নয়। নতুন নতুন বণিকদল আস্তানা খুলছে। কোম্পানির সাথে লিঁয়াজো করে যারা চলতে পারছে তারাই শুধু দুই হাত ভরে পয়সা কামাচ্ছে। ঢাকার বনেদী পরিবারগুলা অধিকাংশই মুর্শিদাবাদে চলে গিয়েছে। এই সুযোগে সিলেট, আসাম আর কলকাতা থেকে ব্যবসায়ীরা এসে খুব সস্তায় বাড়ি কিনে নিচ্ছে ঢাকাতে। তারপর সুবিধা মতো ছক করছে ব্যবসার। আর আর্মেনীয় বণিকরা তো খুঁটি গেড়ে আছে বহু আগে থেকেই। কালক্রমে অধিকাংশই জমিদার। বাজার খালি পেয়ে আর্মেনীয়রাও বরশী ফেলছে। এই সময়ে দেশীয় বণিকদের যারা টিকে ছিলেন তাদের ভিতর অন্যতম ছিলেন রাহমাতুল্লাহর বাবা আতিকুল্লাহ।
আতিকুল্লাহর যশ বৃটিশদের কানেও পৌঁছেছিলো। এর আগে নায়েবে নাজীমদের সাথে প্রচুর দহরম মহরম ছিলো আতিকুল্লাহর।
কিন্তু মোঘলদের পতনের পর থিতিয়ে গিয়েছিলো আতিকুল্লাহর সবকিছু। একদম রাস্তায় পড়া পড়া অবস্থা। সেখান থেকে নিজের যোগ্যতা আর চতুরতায় আবার শাসক শ্রেণীর দৃষ্টি কেড়ে নিয়েছিলো সে। যদিও আগের মতোন কিছুই ছিলো না। একে একে সবাই ঢাকা ছাড়লেও, ঢাকায় থেকে গিয়েছিলেন আতিকুল্লাহ। আভিজাত্য আর বৈভবের পিছুটানে থেকে গিয়েছিলেন। আতিকুল্লাহ ভেবেছিলেন মুর্শিদাবাদ গেলে সবকিছু নতুন করে গুছিয়ে নিতে সময় লাগবে অনেক। সেই সময়টার ভিতরেই ক্ষয় ক্ষতি পুষিয়ে নিতে পারবেন। কিন্তু বিধি বাম। দুই বছরের মাথায় হাতির দাঁত বোঝাই করা নৌকার সাথে তলিয়ে যান আতিকুল্লাহ। লাশটাও পাওয়া যায়নি। ঢাকার অধিবাসীরা মৃত্যুসংবাদ পাওয়ার পর প্রথম দিন গায়েবানা জানাজা পড়ে রাহমাতুল্লাহ আর বাকীবিল্লাহর মাথায় হাত বুলিয়ে যে যার বাড়িতে ঢুকে গিয়েছিলো। দ্বিতীয় দিন মানুষজন সব এসে ভিড় করতে থাকলো কাচারি ঘরে। হাজার হাজার টাকা ঋণ রেখে ডুবেছেন আতীকুল্লাহ। শাহনাজ বানু শুরু করলেন জমি বিক্রি। জমি শেষ হলে গহনা। তবুও শেষ হয় না ঋণের বোঝা। রহমাতুল্লাহর বয়স বিশ। বাকীবিল্লাহর সতেরো। কিন্তু দুটো ছেলেই ননীর পুতুল। আতীকুল্লাহ কাউকেই বাইরের আঁচড় লাগতে দেননি। ব্যবসা শেখা তো দূরে থাক দুই সহোদর জানতোই না কীসের ব্যবসা বাবার।
এমন একদিন সকালে কাচারি ঘরে নিত্যদিন আসা মানুষগুলোর ভিড়ে নতুন একজনকে দেখলেন শাহনাজ বানু। ইউরোপিয়ান। কোম্পানির লোক। দেউড়ির বাইরে রেখে এসেছেন চারজন সেপাই। মালকোচা মারা ধূতি আর খাঁকি কোটি পরা সিপাই দেখে দরদর করে ঘামতে লাগলেন শাহনাজ বানু। এবার বোধহয় বাড়িটাও ছাড়তে হয়। কোম্পানির কাছ থেকেও ঋণ নিয়েছিলো আতিকুল্লাহ?
কিন্তু কোম্পানির লোকটা বৈঠকখানায় বসে হাসিমুখে দুচারটি কথা বলতেই বিষয়টা একটু হালকা হয়ে যায় শাহনাজ বানুর কাছে। দোভাষী রসিয়ে রসিয়ে কথা বলার কারণেও এটা হতে পারে। অন্দরে দাঁড়িয়ে শাহনাজ বানু জানতে পারেন কোম্পানির লোকটি একটি বিশেষ অনুরোধ নিয়ে এসেছেন। ঢাকার অভিজাত ব্যবসায়ী মরহুম আতীকুল্লাহর সকল ঋণের দায় থেকে কোম্পানি মুক্ত করে দিবে। বিনিময়ে কোম্পানিকুঠিনে যোগান দিতে হবে কাঁচামাল।

দুষ্প্রাপ্য যা কিছু রপ্তানি করা হতো ইউরোপে অথবা আরবে। এবার থেকে সবকিছু কোম্পানিকুঠির মাধ্যমে করতে হবে। সোজা কথায় কাজ করতে হবে কোম্পানির সাথে। শাহনাজ বানু অনেক্ষণ চুপ থাকার পর সম্মতি দিয়েছিলেন। চুক্তিবদ্ধ হওয়ার এক দুই মাসের ভিতরেই সকল পাওনাদার পাওনা পয়সা বুঝে পায়। আর সন্তানদুটোকে ব্যবসাসফল না দেখে মহাকালে ডুব দেন শাহনাজ বানু। স্বামীবিয়োগের পর শোক প্রকাশ করার সময়টাও পায়নি এই মহিলা। সন্তানদের সুখ তো দূরের কথা।
এরপর কেটে গেছে প্রায় সাত বছর। কোম্পানিকুঠির কাঁচামালের যোগানদার হিসেবে কাজ করে এখন রহমাতুল্লাহ। পিতা, মাতা এবং সবশেষে ভাইকে হারানোর পর এক প্রকার বাড়ি চৌকি দিতেই বিয়ে করেছিলো সে। বাড়ির চাকরবাকর কমতে কমতে এখন নেই বললেই চলে। আবদুল গফুর কাজ করে ওদের বাড়িতে প্রায় আটত্রিশ বছর। এখনও আছে। শুধু একা নয়। এখন আবদুল গফুরের সাথে আছে ওর ছোট ছেলে আর মেঝমেয়ের জামাই। এই তিনজন পুরুষ চাকর ছাড়াও আছে দুইজন চাকরানি। আবদুল গফিরই মূলত বিয়ে করিয়েছে রহমাতুল্লাহকে। গফুরদের গ্রামের মেয়ে। পরিবার বনেদী না হলেও উঁচু বংশের। মানওয়ালা। মীর জুমলার বংশ বলে দাবি করলেও ধারণা করা হয় মীর জুমলার খুব কাছে থাকা কোনো মোঘল সিপাহির বংশ। যে থেকে গিয়েছিলো অথবা দলছুট হয়ে সংসার পেতেছিলো গ্রামবাংলায়।
রুখসানা কখনও চিন্তা করেনি শহরে আসা হবে। পালকি থেকে নামার পর থেকে এই আজ সকাল পর্যন্ত যে মানুষটা একটা বারের জন্যেও বুঝতে দেয়নি এটা নিজের বাড়ি নয়। মনে করতে দেয়নি ফেলে আসা দিনগুলোর কথা। সারাদিন এই কথা, সেই কথা বলে অস্থির করে করে রেখেছিলো। এক বারো মনে হয়নি বিয়ের আগে কোনোদিন দেখা হয়নি দুজনের। বিয়ে মানেই ভয় ছিলো রুখসানার। একদম অচেনা অজানা একজন মানুষের ঘরে যাওয়া লাগবে। অপরিচিত মানুষের সাথে ঘর করা লাগবে বাকিটা জীবন। কেমন হবে শ্বশুর? কেমনই হবে শ্বাশুড়ি? সেই বাড়ির লোকজন কেমন হবে? এসব নিয়ে তেমন না ভাবলেও ভয়ে ছিলো রুখসানা। কিন্তু রহমাতুল্লাহর সাথে বিয়ে হবার পর সব ধারণা পাল্টে গেছে। শ্বশুর,শ্বাশুড়ি, দেবর, নোনদ কেউ নেই। আছে একজন মানুষ। তাকে স্বামীর থেকে বেশি মনে হয় বন্ধু। সেই বন্ধু চলে গেছে সকালে। সকাল থেকে উপোস রুখসানা। গফুর চাচা অনেকবার এসে ফিরেফিরে যাচ্ছে। খাবার পড়ে আছে খাবারের জায়গাতে। বিছানায় শুয়ে নির্বাক চাহনিতে রুখসানা তাকিয়ে আছে মাথার উপর ঝুলে থাকা চাদোয়ার মতো মশারির দিকে।
রুখসানার বাবা সুজাতপুরের ছোট জমিদারের খাজাঞ্চি। ওরা দুই ভাই বোন। রুখসানা বড়। ছোট ভাই অনেক ছোটই বলা যায়। গ্রামবাংলার অতিসাধারণ না হলেও মধ্যবিত্ত পরিবার ওদের। সুজাতপুরের জমিদারদের বিত্ত বৈভবে সুজাতপুরে দাঁড়ানো মুশকিল ছিলো। খাজনা আদায় করতে বেগ পেতে হতো রুখসানার বাবা বান্দা আলী আজগরকে। কোম্পানি তখনও পুরো ভারতবর্ষের ক্ষমতা পায়নি। কিন্তু হঠাৎ একদিন সুজাতপুরের বড় জমিদার শশীধর সব জমিজায়গা বিক্রি করে দিয়ে কাশী চলে যায় ছোট ভাই শশাঙ্ক হয়ে পড়ে নির্জিব একদিকে ভ্রাতৃ শোক আর জমিদারি নেই বললেই চলে। এক মারোয়াড়ী ব্যবসায়ী কিনেছিলো শশীধরের কাছ থেকে জমিন। জালিয়াতি করে একটু একটু করে বাড়িয়েই চলেছে সীমানা। সে তাঁর নায়েব রেখে গেছে খাজনা আদায়েন জন্য। নাম সর্বস্ব মাত্র কয়েক বিঘা নিয়ে জমিদারি করেন শশাঙ্ক। নাম মাত্র জমিদার। অধীনস্থ কর্মচারীরা একে একে বিদায় নিয়েছে। থেকে গিয়েছে বান্দা আলী আজগর।
বান্দা আলী আজগর মুসলিম হলেও শশাঙ্কের খুব আস্থাভাজন। মেয়ের বিয়ের খবর দিতেই শশাঙ্ক দেড়শো রৌপ্যমুদ্রা উপঢৌকন দিয়েছেন মেয়েকে দেওয়ার জন্য। আলী আজগর ভালো করেই জানে কত কী অর্থকড়ি আছে শশাঙ্কের। তাই ফিরিয়ে দিয়েছে। চুপিচাপি মারোয়াড়ির হয়ে কাজ করে আরো বেশি অর্থ পায় সে। খুব করুণা হয় শশাঙ্কের জন্য। কিন্তু ছাড়তে পারে না মায়ার কারণে। অন্যদিকে পেট চলে না মায়াতে। তাই পেটের দায়ে কাজ করে মারোয়াড়ির হয়ে। আজগর জানে, একদিন ধরা খেতে হবে। কিন্তু মা মরা সন্তানদুটোর দিকে তাকিয়ে এসব করছে। অন্ততপক্ষে না খেয়ে মরার থেকে ভালো। মেয়ের বিয়ে হয়েছে শুধু জমিদারের হযে কাজ করার সম্মানে। নাহলে ঢাকার বনেদী ঘরের বৌ হয়ে কখনই যেতে পারতো না রুখসানা।
সুজাতপুরের ছোট জমিদারের খাজাঞ্চি বান্দা আলী আজগরের কন্যা রুখসানা এখন কাঁদছে ঢাকার অভিজাত ব্যবসায়ী মৃত আতীকুল্লাহর পুত্র রহমাতুল্লার জন্য।
রহমতুল্লাহ খুব সাধাসিধে গোছের মানুষ। আরেকটু বিশ্লেষণ করলে বলা যেতে পারে বোকাসোকা। ব্যবসা ছিলো রক্তের ভিতর তাই শুধু ওটাই পারে ঠিকমতো। এর বাইরের কিছুই ধাতে নেই। বোকাসোকা এই রহমাতুল্লাহ বুড়িগঙ্গা ছেড়ে ধলেশ্বরে ঢোকার পর থেকে কেঁদেই যাচ্ছে নীরবে। জয়নাল মাঝি দাঁড় ধরে হতচকিত হয়ে তাকিয়ে আছে। পিছনের নৌকা ভর্তি কাঁচামাল। পাটাতনে বসে গল্প করতে থাকা আইনাল আর ফারুকও তাকিয়ে আছে অবাক চোখে। রহমাতুল্লাহ কেঁদেও চলেছে। নৌকা চলছে। ছলাৎ ছলাৎ শব্দ পানির। এই শব্দের ভিতর দিয়ে মাঝেমধ্যে হেচকি তুলছে রহমাতুল্লাহ। নৌকার পাল উড়ছে আর ভেসে যাচ্ছে নৌকার পাটাতন। এই কান্না ভালোবাসার।

চলবে…

Editor - Shuvro Kagoj

আমরা সাহিত্য চর্চাও করবো না, লেখকও তৈরি করবো না, সম্পাদনাও করবো না, কেবল প্রকাশ করবো স্বপ্ন আর সৌহার্দ্য।

আপনার লেখা আজেই পাঠিয়ে দিন শুভ্র কাগজে। এই কাগজ প্রকাশ করবে আপনার প্রীতি।