লজ্জার মৃত্যু

-কিরে! এই কয়দিন ধরে কলেজ আসিসনি ক্যান?
-কোথায় গিয়েছিলি?
-না কি ওইতা হয়েছিল…?
নিশিতার চেহারা লজ্জায় লাল হয়ে উঠে। কি বলবে এখন? সে ভেবে পাচ্ছে না। লজ্জাকর বিষয়! যদিও তারা অন্তরঙ্গের বন্ধু। সব কথা বন্ধুদের সাথে শেয়ার করা যায় না!
সিয়াম, আবির, জারা, স্নেহা। এরা নিশিতার ছোটবেলার বন্ধু। সেই স্কুলজীবন থেকে এই কলেজ লাইফ একই সাথে পড়ে আসছে তারা। হাসিঠাট্টা, গল্পগুজব সবই হয় তাদের মাঝে। এমন কী তারা নিজেদের জীবন গল্প একে অপরের সাথে শেয়ার করে। কোনো কিছুই লুকিয়ে রাখে না। নিত্যদিনে যা কিছু করে, যা হয় সবই তারা একে অপরকে বলে। তবে নিশিতা অন্য মেয়েদের কাছ থেকে কোনদিনও পিরিয়ডের ব্যাপারে শুনেনি।এমন কি সে নিজেও জানে না তা কেমন? কেনো হয়? কিভাবে হয় ইত্যাদি…
আর মেয়েদের প্রতি মাসে রক্তস্রাব হয়। যাকে পিরিয়ড বা হায়েজ বলে। নিশিতার তা এখনও হয়নি। সে এ ব্যাপারে জানেও না। নিশিতার বয়স সবে ১২ বছর। আর মেয়েদের ৯ বছর থেকে পিরিয়ড হওয়া আরম্ভ হয়।
নিশিতার ১২ বছর বয়সের কোনো দিনও তার পিরিয়ড হয়নি। এই প্রথম..
নিশিতা সেদিন কলেজ শেষ করে বাড়ি ফিরে। দুপুরের খাবার শেষ করে নিজ রুমে চলে যায়। শরীরটা খুব ভালো যাচ্ছিল না বলে সে বিছানায় শুয়ে পড়ে। কিন্তু হঠাৎ-ই সে অনুভব করে তার তলপেটে ব্যাথা উঠেছে। সে বুঝতে পারেনি ব্যাথাটা কিসের। সে প্রচন্ড ব্যাথায় বিছানার এপাশ-ওপাশ কাটছিলো। এরই মধ্যে সে দেখতে পেল যে, তার পায়জামাতে লাল দাগের চিহ্ন। সে প্রথমে ঘাবড়ে যায়, লাল দাগ কিসের? কোথাও কেটে-টেটে গেছে নাকি?
সে যখন দেখলো যে, এই রক্ত তার জরায়ু থেকে বের হচ্ছে, সাথে প্রচন্ড ব্যাথা। তখন সে দৌঁড়ে গিয়ে তার মাকে বলে। কারণ,এই প্রথম…
তার মা নিশিতাকে সব খুলে বুঝিয়ে বলে দিলো যে, প্রতিটি মেয়ে যখন প্রাপ্ত বয়ষ্কা হয়ে উঠে তখন তাদের প্রতিমাসে রক্তস্রাব মানে পিরিয়ড হয়।আর পিরিয়ড হলে তলপেট ব্যাথা করে। ঠিকমত হাঁটতে পারে না…
নিশিতা পরের দিন আর কলেজ গেলো না। যখন তার পিরিয়ড বন্ধ হলো তখন সে কলেজ যায়। (পিরিয়ডের সময় সীমা ৩/৭ দিন। কারো কারো ৩ দিন, আবার কারো কারো ৭ দিন। এর কম বা বেশি হলে তাকে ইস্তিহাযা (অসুস্থতার রক্তস্রাব) বলে।
কলেজ গিয়েই নিশিতাকে বন্ধুদের প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়। এতো দিন সে কোথায় ছিল? কি হয়েছিল? কলেজ কেনো আসে নি? নানান প্রশ্ন…
নিশিতা কি বলবে? বুঝে ওঠতে পারছে না। সে থত-মত খেয়ে বললো না! তেমন কিছুই হয় নি, এই একটু অসুস্থ ছিলাম।
এমনি সময় জারা বলে ওঠে, কি অসুখ ছিলো বল না…? লজ্জা করছিস ক্যান? আমরা আমরাই তো তাই না!! এই বল না!
-কি ওইতা হয়েছিল নাকি?? আবিরের কণ্ঠে ভেসে আসে।

নিশিতা বাকরুদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। চোখে মুখে লজ্জার ছাপ দেখা যাচ্ছে। ভাষা যেনো নিরবতা পালনে ব্রত। থঁ মেরে চুপ! কি বলবে কিছুই বুঝতে পারছে না। এদিকে নিশিতার চুপ থাকা নিয়ে তার বন্ধু-বান্ধবী সবাই হাসাহাসি করছে। অবশেষে নিশিতাকে বলতে বাদ্ধ করেছে তাদের অকথ্য কথাবার্তা।
-হুঁ…! ওইতা হয়েছিল।(লজ্জা নিয়ে বলল নিশিতা)
-কিরে ইয়ার! শুধু ওইতা ওইতা বলছিস ক্যাঁ! ওইতা টা কি? তার নাম বল না?? স্নেহা বলে উঠলো।
এবার সবাই স্নেহার কথায় সায় দিয়ে সমুচ্চরে বলল, বল না দোস্ত!!
লজ্জার মাথা খেয়ে নিশিতা এবার বলেই ফেললো- প্রতি মাসে মেয়েদের যেই সমস্যা হয় সেটাই আমার হয়েছে মানে পিরিয়ড।

এমনই অহরহ ঘটনা আজ আমরা খোলামেলা ভাবে বলি, লজ্জাবোধ করি না। বেডরুমের কথা পর্যন্ত আমরা কলেজ ক্যাম্পাসে কিংবা বন্ধুদের বলতে দ্বিধাবোধ করি না। একজন মেয়ে যদিও বলতে লজ্জাবোধ করে কিন্তু বন্ধুদের চাপে পড়ে নিরুপায় হয়ে বলতে বাদ্ধ হয়। আজ আমাদের সমাজে লজ্জাবোধ নামক বস্তু মুক্তমনা চেতনার অন্তরালে চাপা পড়ে গেছে। আমরা মোটেও লজ্জাবোধ করি না। ছেলে কিংবা মেয়ে, সবাই সমানে সমানে। মূলত এখানে ছেলেরাও কিছুতেই কম না। ছেলেরাও দোষী। কারণ, ছেলেরা মেয়েদের সম্পর্কে অঘাধ জ্ঞান রাখে। মেয়েদের গোপনীয়তা বিষয়ে গবেষণা করে। যা একজন মেয়েও করে না।
অথচ আগের যুগের মেয়েদের দিকে দৃষ্টিপাত করলে দিবালোকের ন্যায় অনুধাবন হয় যে, তাদের মধ্যে লজ্জাবোধের মূল্যায়ন কতটুকু ছিল? তারা সামান্য কথাতেও লজ্জাবতী হতো। আর আমাদের যুগের মেয়েরা!
হায় আফসোস। মেয়েরা আজ কত নিচু হয়ে গেছে। কত নিম্ন মানষিকতার পরিচয় বহন করে যাচ্ছে। হোস্টেল কিংবা কলেজ সব জায়গায় পরিলক্ষিত হয় অবাধ বিচরণ, অবৈধভাবে মেলামেশা (??)এমন কী ফার্মেসীর দোকান সহ রাস্তাঘাট, পার্ক কিংবা বলো শপিংমল
সব জায়গাতেই ওপেনিং কথাবার্তা, উঠাবসা।
আজ আমাদের ছেলেরা মেয়েদের পার্সোনালিটি নিয়ে গবেষণায় মত্ত। যা মেয়েদের নলেজের বাহিরে। কল্পনাতীত। কেউ কল্পনাও করতে পারে না যে, ছেলেরা মেয়েদের অগোচরে এত্ত কিছু কাজ করে। (এখানে ছেলেদের হেয়পতিপন্ন করা আমার মূখ্য উদ্দেশ্য নয়। বাস্তবতা কেমন? তা চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়া।)
মেয়েরাও হুবহু তাই! আবার ছেলেরা মেয়েদের বিষয়ে সব কিছু জানতে তাদের প্রেমিকা বা বান্ধবীদের জিজ্ঞেস করে। আর মেয়েরাও ছেলেদের মিষ্টি ও মন ভোলানো কথায় পাগল হয়ে লজ্জার মাথা খেয়ে নির্লজ্জভাবে সব কিছু খুলে বলে। যা স্বামী-স্ত্রীরাও বলতে দ্বিধাবোধ করে।
অথচ, পিরিয়ড এটা কলেজ ক্যাম্পাসে বলার মত বিষয় না। এটা এক গোপনীয় বিষয়। গোপন রাখতে হয়। আর যে মেয়ের পিরিয়ড হয় কেবল সেই বুঝে কত কষ্ট। কিন্তু একপ্রকার বখাটে ছেলেরা; মেয়েরা যদি কিছুদিন কলেজে না আসে তখন তা নিয়ে হাসিঠাট্টা করতে আরম্ভ করে। যার ফলে দেখা যায় যে, মেয়েরাও এহেন পরিস্থিতিতে কলেজ আসতেও লজ্জাবোধ করে। যদিও কিছুটা লজ্জাবোধ তখন জেগে উঠে কিন্তু পরবর্তিতে তা যেনো নিমিষেই শেষ হয়ে যায়।
মূলত প্রতিটি মেয়ে প্রতি মাসে যেই হারে কষ্ট ভোগ করে তা বলার মত না। কিন্তু এ যুগের মেয়েরা শুধু বলাতেই ক্ষেন্ত হয় না। এমন কি সব কিছু খুলে বলে ও দেখায়। পিরিয়ড কি? তা কেমন মানে রঙ কেমন?
(ফিকহী কিতাবে যদিও পিরিয়ডের রঙ সাত প্রকার বর্ণনা করেছে যেমন লাল, নীল, হলুদ, সবুজ, সাদা, কালো ও মেটে। তবে লাল রংটায় বেশি দেখা যায়।) আর তা কেনো হয়? কিভাবে হয়? হলে কি হয়? কোথায় ব্যথা জমে এ যাবতীয় আরো!
বলতে গেলে-আজ মেয়েদের মাঝে লজ্জা বলতে মোটেও নাই। ছোটকালের একটি গল্প পড়ার কথা মনে পড়ে গেল, বইয়ে পড়েছিলাম “পাঠকের মৃত্যু” নামে একটি গল্প। সেখানে লেখক বলেছিলেন- “পাঠকের মৃত্যু ঘটেছে”। তখন এই বাক্যের মর্মার্থ আমার বুঝে আসেনি।আজ বুঝেছি লেখক কেনো এমনটি বলেছিলেন। এমনি আজকের এ যুগে আমাদের “লজ্জার মৃত্যু” ঘটেছে।

– আ.র.ফ আসআদ ইবনে শাহীন
চট্টগ্রাম আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় “আল জামিয়া আল ইসলামিয়া পটিয়া” চট্টগ্রাম।

আমরা সাহিত্য চর্চাও করবো না, লেখকও তৈরি করবো না, সম্পাদনাও করবো না, কেবল প্রকাশ করবো স্বপ্ন আর সৌহার্দ্য।

আপনার লেখা আজেই পাঠিয়ে দিন শুভ্র কাগজে। এই কাগজ প্রকাশ করবে আপনার প্রীতি।