সুন্দর জীবনের ভয়ঙ্করী বৃহস্পতিবার

লিখেছেন
নাহিদ আহসান
অধ্যায়নরত
বিজিএমইএ ইউনিভার্সিটি অফ ফ্যাশন এন্ড টেকনোলজি

ক্লাস শেষ। যে যার যার মত যতো দ্রুত সম্ভব ক্লাস থেকে বের হচ্ছে। কেউ কেউ কথা বলতে বলতে যাচ্ছে কাল কি হবে। আমিও বইখাতা গুছিয়ে ব্যাগটা এক কাঁধে নিয়ে যতোদ্রুত সম্ভব বের হলাম। ক্যাম্পাসে আর না দাঁড়িয়ে রিকশায় করে আমিও রওনা দিলাম বাসার উদ্দেশ্যে। এত তাড়াহুড়া আর দুশ্চিন্তাযুক্ত ছাত্রছাত্রীর ক্যাম্পাস ত্যাগের একটাই কারণ, কাল দিনটার উপর মহাবিপদসংকেত জারী করা।

বৃহস্পতিবার। এই বৃহস্পতিবার আমাদের জীবনে খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে যেদিন থেকে আসলাম কবীর স্যার আমাদের ক্লাসে এসেছেন। ক্লাসে এবং পুরো ক্যাম্পাসে স্যারের গোপন ডাক নাম ঘাড়ভাঙা বীর। স্যার যখন ক্লাসে দানবের মতো হুংকার দেন, তখন স্যারের ঘাড় বাকা হয়ে যায়। আর ঠিক এই কারণেই স্যারের এই গোপন নাম। স্যারও হয়তো জানে। প্রতি বৃহস্পতিবার স্যার আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস নিতে আসেন দূর থেকে এবং সারাদিনে প্রায় পাঁচ কি ছয়টা ক্লাস নেন। অইদিনের জন্য অই পাঁচ-ছয়টা ক্লাসের শিক্ষার্থীদের উপর যেন কারফিউ অবস্থা জারী হয়ে যায়। কি স্যার, আল্লাহ!

ক্যাম্পাসে একদম সময় না দিয়ে দ্রুত বাসায় ফেরার কারণ কাল বৃহস্পতিবার। কবীর স্যারের ক্লাস এবং কাল স্যার আমাদের পরীক্ষা নিবেন। যেদিন বিপদ আসে, যেন সব দিক থেকেই আসে। প্রথম কথা পদার্থবিদ্যা এম্নিতেই কঠিন, তার উপর কবীর স্যার, তার উপর পরীক্ষা। আজ রাতে ঘুম হবে কিনা ভাবতে ভাবতে আমি পৌঁছে গেলাম বাসায়। ” মা, খাবার দেও। “, বলে চিৎকার করেই ঢুকলাম গোসলখানায়। অনেকখন যাবত গোসল করলাম। একটু ঠান্ডা ঠান্ডা লাগছে। খেয়ে একটা জম্পেশ ঘুম দিব। তারপর পড়াশুনা করব। না না! খেয়েই পড়তে বসব। তাড়াতাড়ি পড়ে, তারপর ঘুমাব, এক ঘুমে কাল সকাল। খাওয়া দাওয়া করে পড়তে বসলাম। মাঝখানে একটু হাঁটাহাটি করলাম, আবার পড়লাম। পড়া একটু হয়েছে ভাল মতোই। একটু ভাল লাগছে ভিতরে, আগের চেয়ে। রাতের খাবার খেলাম পেট ভরে, ইশ মায়ের হাতের রান্না তো নয় যেন অমৃত। অধিক টেনশন থেকে একটু মুক্ত হলে সব খাবারই অমৃত মনে হয়। এবার দিলাম ঘুম!

” রাসেল উঠ! সকাল হইছে তো, ভার্সিটি যাবি না আজকে? ” মা চিল্লাচ্ছে অই রুম থেকে।

” না “, একটা লম্বা টান দিয়ে না বললাম। ভাবলাম শরীরটাও একটু ব্যাথা করতেছে, ঘুমাই আরেকটু। আবার ঘুমালাম। খুব ভালোই লাগছে। এবার স্বপ্নে দেখলাম, কি সুন্দর আবহাওয়া বাহিরে। ঘুড়তেছি কি সুন্দর রাস্তায় রাস্তায়। একটা পুকুরঘাটে গিয়ে বসলাম। হাঁটতে হাঁটতে ক্লান্ত এখন। একটা প্রকাণ্ড গাছের নীচে বসলাম, বাতাস তো নয় যেন অন্য কিছু! কিহ আরাম বাবারে বাবা। এবার পুকুরের ঘাট থেকে হাত দিয়ে পানি নিয়ে যেই না মুখে একটু পানি দিলাম, ইশ কি ঠান্ডা। জীবন টা তো অনেক সুন্দর! অমনি ঘাড়ভাঙা বীর আমার ঘাড় ধরে পানিতে চুবিয়ে রেখে আমায় বলতেছে, ” আজকে কি বার? মনে থাকে না? ”

স্বপ্ন ভাঙলো। আমি ঘুমাচ্ছি বুঝতে পারলাম। তাইতো! কি বার আজকে? ঘুমের মধ্যে মনে করার চেষ্টা করলাম। মনে পড়তেসে না। আবারও মনে করার চেষ্টা করলাম আজকে কি বার। তাও হচ্ছে না। আমি আবারও একটু ঘুমিয়ে পড়লাম। মা এবার আমার ঘরে এসেই চিৎকার দিয়ে বলতেসে, ” কাল শুক্রবার, কাল ঘুমাবি, তুই ঘুমাইতাছস আজকে। যাবি না ক্যান ভার্সিটি? “

তার মানে কাল শুক্রবার আর আজকে হলো, উফ আল্লাহ! শেষ আজকে সব! আমার উপর দিয়ে আজ সাইক্লোন, সিডর কয়েকবার যাওয়া আসা করবে এটা ভাবতে ভাবতে আমি হুড়মুড়িয়ে উঠলাম। ঘড়িতে দেখলাম নয়টা বাজতে প্রায় বিশ মিনিট বাকি এখনও। আমি এই বিশ মিনিটে কি করলাম কিছুই জানি না। শুধু জানি আমি শ্বাস নিতে পারতেছিলাম না। কেমন যেন দম আটকে ছিলো। রিক্সাওয়ালার ভাড়া বিশ টাকা। আমি একশটাকার নোট দিয়ে ভোঁ দৌড় দিয়ে একদম ক্লাসে। ক্লাসে পিনপতন নীরবতা। সবাই আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আমার শরীর থেকে যেন ঘাম ঝড়তেসে বৃষ্টির মতোন। আমি খুব ভয় নিয়ে ক্লাসের ভিতরে তাকালাম।
” আর দুই মিনিট আছে, দোস্ত! ” কে যেন বলে উঠল। স্যার আসেনাই এখনো। জীবনটা আসলেই সুন্দর। আর অসুন্দর শুধু এই বৃহস্পতিবার!

আমরা সাহিত্য চর্চাও করবো না, লেখকও তৈরি করবো না, সম্পাদনাও করবো না, কেবল প্রকাশ করবো স্বপ্ন আর সৌহার্দ্য।

আপনার লেখা আজেই পাঠিয়ে দিন শুভ্র কাগজে। এই কাগজ প্রকাশ করবে আপনার প্রীতি।