অর্থনীতির আদ্যোপান্ত- Shuvro Kagoj

অর্থনীতির আদ্যোপান্ত

লিখেছেন
হাসান ইনাম

আমার বন্ধু রকিবকে সেদিন বললাম ‘জানিস, ইকোনোমিক্সের জনক এরিস্টটল। উনি…’ আমার কথা শেষ করার আগেই রকিব তো রেগেমেগেই শেষ। ইচ্ছেমতোন বকাঝকা করলো আমাকে। কথা শুনালো একগাদা। আমি নিশ্চিত যে, আমি যদি এই লেখার শুরুতে রকিবের কথা না বলে সরাসরি লেখতাম ইকোনোমিক্সের জনক হলেন এরিস্টটল। তাহলে তুমিও চটে যেতে। ব্লগ পড়া থামিয়ে আমাকে ম্যাসেজ লিখতে বসতে। অথবা অভিযোগপত্র লিখতে তরুণ প্রভাত কর্তৃপক্ষ বরাবর। বলতে , ‘এসব ভুলভাল তথ্য ভরা ব্লগ দিয়ে আমাদের বিভ্রান্ত করছেন কেন ভাই? এমনিতেই পরীক্ষায় পাস করতে পারি না। সারাজীবন বইতে পড়ে আসলাম ইকোনোমিক্সের জনক হলেন এ্যাডাম স্মিথ। আর আজকে শুনছি এরিস্টটল। কোনটা বিশ্বাস করবো? কেন ভাই? এই একটা মানুষকেই কেন সবকিছুর জনক হতে হবে?’ এরকম অসংখ্য প্রশ্ন আর অভিযোগ তোমার মনে উঁকিঝুঁকি দিচ্ছে জানি। চলো সামনে আগাই। দেখা যাক কীভাবে তোমার মনকে প্রশান্ত করা যায়।

প্রাচীন গ্রিসে সর্বপ্রথম চর্চা শুরু হয় অর্থনীতির। এরিস্টটল রাষ্ট্রের কাজের সুবিধার্থে
একটি কোষাগার খুলেন। এই কোষাগারের নাম দেন ‘ব্যবস্থাপনা গৃহ’। পরবর্তীতে ‘গৃহ
ব্যবস্থাপনা’ নামে সেই গৃহ থেকে অর্থনীতির চর্চা হয় । এখন প্রশ্ন হলো এই কথা
তুমি কেন বিশ্বাস করবে? তাইতো! চলো, তার আগে আমরা Iconomics শব্দটি
বিশ্লেষণ করে আসি। সেখানেই তুমি তোমার প্রশ্নের উত্তর পেয়ে যেতে পারো।

আমরা সবাই বইতে পড়েছি Iconomics শব্দটি এসছে গ্রিক শব্দ oikonomia থেকে।
বলতে পরো oikonomia অর্থ কী? oikonomia শব্দটি মূলত যৌগিক শব্দ। গ্রিক শব্দ
oikos এবং nomas মিলে গঠিত হয়েছে oikonomia। oikos অর্থ গৃহ আর nomas
অর্থ ব্যবস্থা। oikonomia অর্থ গৃহ ব্যবস্থাপনা।

ধরো অর্থনীতি হলো একটি পিলার। এরিস্টটল সাহেব এই পিলার তৈরি করার জন্য
শুধু মাটি খুঁড়েন। কিন্তু ভিত্তি স্থাপন করেননি। অর্থাৎ শুধু সাম্যক ধারণা দিয়েই চলে

যান। পরবর্তীতে এরিস্টটলের খোদিত সেই জায়গার উপর পিলারের জন্য ভিত্তি স্থাপন
করেন এ্যাডাম স্মিথ। ১৭৭৬ সনে এ্যাডাম স্মিথ An ‘enquray into the nature
and causes of the welth of nation’ গ্রন্থে সর্বপ্রথম অর্থনীতিকে স্বতন্ত্র শাস্ত্র বা
বিজ্ঞান বলে আখ্যায়িত করেন। তিনি বলেন ‘অর্থনীতি হলো এমন একটি বিজ্ঞান যা
জাতিসূহের সম্পদের প্রকৃতি ও কারণ অনুসন্ধান করে থাকে। এ্যাডাম স্মিথ অর্থনীতির
ভিত্তি স্থাপক বা জনক। এ্যাডাম স্মিথকে আবার অর্থনীতির ক্লাসিক জনকও বলা হয়।
তারমানে আরো জনক আছে অর্থিনীতির? আছে তো বটেই। ক্লাসিক অর্থনীতিবিদ,
নিউ ক্লাসিক অর্থনীতিবিদ, আধুনিক অর্থনীতিবিদ। এখন তুমি বলবে ‘বাবারে বাবা!
এত জনকের নাম মনে রাখবো কীভাবে? এমনিতেই কত চিত্র আর সূচী মাথায়
রাখতে হয়।’ আচ্ছা বাদ দাও এসব অর্থনীতির কথা। চলো একটু গল্প করি।
আমার বাসায় একটা বাবু আছে। ওর বয়স মাত্র এক বছর থেকে একটু বেশি। কথা
বলতে শিখছে একটু একটু। আমি বাইরে থেকে বাসায় আসলে ‘ছাছছু ছাছছু’ বলে
দৌড়ে আসে। একদিন বাসায় আসার পর দেখি বাবু কাঁদছে খুব। আর আধো আধো
বুলিতে কী যেন বলছে কান্নার ফাঁকে ফাঁকে। আমি একটু বুঝতে চেষ্টা করলাম ও কী
বলছে। খাতা কলম নিয়ে ওকে পাশে এনে বসালাম। আধো আধো বুলি লিখে রাখবো
বলে। যদি অর্থ বের করা যায় আরকি। বুঝোই তো, কাজ না থাকলে মানুষ
কতকিছুই করে।
বাবুর প্রথম বুলি ছিলো ‘এ্যা…সে রিমিম্যা…..’। আমি খুব কষ্ট করে লেখলাম
বুলিটা। একটু পর দেখি কান্নার ধরণ পাল্টে ফেলেছে। নতুন সুরে আওড়ানো শুরু
করেছে নতুন বুলি। এবার কাঁদছে আর বলছে ‘মা…ফি এ কাও’। আবার একটু পর
আরেক সুর। এবার বলা শুরু করেছে ‘র…রা… স্যাস অঅঅঅঅ…’।
তাহমিদের কান্না শেষ হলে আমি বসলাম অর্থ বের করার জন্য। তোমরা নিশ্চয়
ভাবছো এটা কীভাবে সম্ভব!! বাচ্চাদের এসব বুলির মানে আছে নাকি?
আমি কিন্তু ঠিকই বের করে ফেলেছি অর্থ। এই ব্লগের শেষে জানাবো কী বের
করলাম আমি। চলো আবার ফিরে যাই আলোচনায়।
বলছিলাম এ্যাডাম স্মিথের কথা। এ্যাডাম স্মিথের স্থাপন করা ভিত্তিতে আরো চুন
সুরকি যোগান দেন অর্থনীতিবিদ জেবিসে, অর্থনীতিবিদ রিকার্ডো, অর্থনীতিবিদ মিল
এবং অর্থনীতিবিদ ম্যালথাস। উনারা সবাই ক্লাসিক অর্থনীতিবিদ ।মনে করো
এরিস্টটলের খোদিত মাটিতে উনারা সবাই মিলে একটা পিলার দাঁড় করান। কিন্তু

১৯৩১ এ বসে এল রবিন্স দেখতে পান সেই পিলার। কিন্তু উনার মনে হয় কোথাও
একটু সমস্যা আছে। অর্থনীতি মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সাধারণ কাজকর্ম নিয়ে
আলোচনা করে ঠিকাছে। অর্থনীতি সম্পদের বিজ্ঞান সেটাও ঠিক আছে। কিন্তু মানুষের
সম্পদ কেমন? অঢেল নাকি সীমিত? উনি ‘An eassy on the nature and
significance of iconomices science’ নামে একটা বই প্রকাশ করেন। সেখানে তিনি
সর্বপ্রথম অর্থনীতিকে সীমিত সম্পদের বিজ্ঞান বলে আখ্যায়িত করেন। অর্থনীতিতে
দুটো ধারণার প্রচলন করেন এল রবিন্স। ১. অসীম অভাব ২. সীমিত সম্পদ। এখন

সেটা মাত্র পাঁচ ইট সমান লম্বা। এটাকে তো আরো উচুঁ করতে হবে। সবাইকে
দেখানোর মতো উঁচু করতে হবে। তাই না?
এই উচুঁ করার কাজে হাল ধরেন অধ্যাপক মর্শাল। ১৮৯০ সালে তিনি এসে নতুন
ধারণার সংযোজন করেন। সবকিছুই ঠিকাছে। তিনি মেনে নেন অর্থনীতি একটি
বিজ্ঞান। এই বিজ্ঞান জাতিসূহের সম্পদের প্রকৃতি ও কারণ অনুসন্ধান করে থাকে
সেটাও মানেন। কিন্তু জাতিসমূহ কাদের? বন্যপ্রাণীদের? কাদের সম্পদের প্রকৃতি ও
কারণ অনুসন্ধান করা হয়? গরুদের সম্পদের নাকি ছাগলদের? নাকি বনের রাজা
সিংহের? এই প্রশ্নের উত্তর পেতে হলে তোমাকে পড়তে হবে অধ্যাপক মর্শালের লিখিত
বই ‘Principle of Iconomics’ । এই বইতেই সর্বপ্রথম তিনি বলেন ‘অর্থনীতি হলো
এমন একটি বিষয়, যা মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সাধারণ কাজকর্ম নিয়ে আলোচনা
করে।’
এখন কেউ হয়তো বলবে, ‘আমিও তো মানুষ। অর্থনীতি তো আমার কাজকর্ম নিয়ে
আলোচনা করে না।’ কে বলেছে করে না? তুমি কী খাও সকালে? রুটি না ভাত?
নিশ্চয় দুটো একসাথে খাও না। যেকোনো একটা খাও। এই রুটি আর ভাতের জন্য
গম আর ধানের ভিতর কোনটা রেখে কোনটা উৎপাদন করা হবে সেটাই তো নির্ণয়
করা হয় উৎপাদন সম্ভাবনা রেখার মাধ্যমে। এভাবে হিসেব করে দেখো তোমার
দৈনন্দিন কাজকর্মের সবকিছু নিয়েই আলোচনা করা হয় অর্থনীতিতে।
অধ্যাপক মর্শাল ছিলেন নিউ ক্লাসিক অর্থনীতিবিদ। উনি পিলারের ভিত্তিটা আরেকটু
মজবুত করেন আর আরো একটু উঁচু করেন। উনার সাথে সাথে ফিডম্যান, এইজ
ওয়ার্থ, ক্লার্ক, ওয়ালসার সহ প্রমুখ অর্থনীতিবিদরা পিলারকে উঁচু করেন। উনারা সবাই
নিউ ক্লাসিক অর্থনীতিবিদ। পিলারকে উনারা দশ ইটের সমান উঁচু করে ফেলেন।
এবার দূর থেকে একটু একটু দেখা যায়।

আমরা এল রবিন্সের সংজ্ঞাটাই সবখানে পড়ে থাকি। এল রবিন্স ছিলেন আধুনিক
অর্থনীতিবিদ।See also

এখন প্রশ্ন হলো অর্থনীতি আবার দুই ভাগ কেন? প্রথম পত্র আর দ্বিতীয় পত্রের
ঝামেলা করলো কে? এমনিতেই এত সাবজেক্ট। এর ভিতর আবার অর্থনীতিরও দুইটা
পত্র।
১৯৩৩ সালে রাগনার ফ্রিশ আলোচনার সুবিধার্থে অর্থনীতিকে দুইভাগে ভাগ করেন।
MICRO এবং MACRO। যা আমরা ব্যাষ্টিক আর সামষ্টিক অর্থনীতি হিসাবে চিনি।
এই রাগনার ফ্রিশ অর্থনীতিতে প্রথম নোবেল জয়ী। ১৯৬৯ সনে রাগনার ফ্রিশ
অর্থনীতিতে নোবেল পান।
ভ্রু কুঁচকে ফেললে কেন? ভাবছো এটা কীভাবে সম্ভব? ১৯০১ সনে নোবেল দেওয়া
শুরু হয় আর আমি কি-না বলছি অর্থনীতিতে প্রথম নোবেল পান অর্থনীতিবিদ
রাগনার ফ্রিশ। তাও আবার ১৯৬৯ সনে? মনে মনে বলছো ‘আর কত ঘোল
খাওয়াবেন ভাই?’
তাহলে শোনো , একদম শুরু থেকেই কিন্তু অর্থনীতিতে নোবেল দেওয়া হতো না।
নোবেল কমিটি তাদের লিস্টে অর্থনীতিকে যুক্ত করেন ১৯৬৮ সালে। আর ১৯৬৯ এ
দেওয়া হয় সর্বপ্রথম অর্থনীতিতে নোবেল।
আবার ফিরি পিলারের গল্পে । রাগনার ফ্রিশ আর এল রবিন্স পিলারের ক্ষয় হয়ে
যাওয়া অংশগুলো ঠিক করে দেন। এবার দেখতে ভালোই লাগে। কিন্তু শুধুমাত্র ইটের
দেয়াল দেখতে কেমন যেন লাগে তাই না? একটু রং করলে ভালো দেখাতো । এই
রংয়ের কাজ করেন পল স্যামুয়েল। তিনি অর্থনীতিকে উন্নয়নের বিজ্ঞান বলে
আখ্যায়িত করেন। পল স্যামুয়েলকে বলা হয় আধুনিক অর্থনীতির জনক। পল
স্যামুয়েল নোবেল পান ১৯৭০ সনে।
একজন বাঙালি অর্থনীতিবিদও কিন্তু নোবেল পান অর্খনীতিতে। জানো তো তার
কথা? ভারতীয় অর্থনীতিবিদ অমার্ত্য সেন এশিয়ার ভিতর অর্থনীতিতে একমাত্র
নোবেল জয়ী।
অর্থনীতি যদি তোমার প্রির সাবজেক্ট হয়ে থাকে তাহলে আজকে থেকে আরো সময়
দাও এই বিষয়ের উপর। তুমিও তো হতে পারো আরেকজন অমার্ত্য সেন।

ও আচ্ছা, আধো আধো বুলির ব্যাখ্যা তো দেওয়া হয়নি। ওটা দিয়েই শেষ করি।
১. এ্যা…সে রিমিম্যা…..
২. মা…ফি এ কাও
৩. র…রা… স্যাস অঅঅঅঅ
এই তিনটা বাক্যই তো ছিলো। এগুলোর অর্থ বের করার সামার্থ্য আমার নেই।
আমি এগুলো দিয়ে বানিয়ে ফেলেছি অর্থনীতিবিদদের নাম মনে রাখার কৈাশল।
এ্যা…সে রিমিম্যা….. এটা দিয়ে বানিয়েছি ক্লাসিক অর্থনীতিবিদদের নাম মনে রাখার
কৈাশল।
এ্যা – এ্যাডাম স্মিথ
সে – সে (জেবিসে)
রি – রিকার্ডো
মি- মিল
ম্যা- ম্যালথাস
আর ‘মা…ফি এ কাও, হলো নিউ ক্লাসিক অর্থনীতিবিদদের জন্য।
মা- মার্শাল
ফি- ফিডম্যান
এ- এইজ ম্যান
কা- ক্লার্ক
ও- ওয়ালসার

শেষের বাক্য ‘র…রা… স্যাস অঅঅঅঅ’ আধুনিক অর্থনীতিবিদদের জন্য।
র- রবিন্স

রা- রাগনার
স্যা- স্যামুয়েল
স- সলো
অ- অমার্ত্য
দেখেছো বাবুর কান্নাকেও কীভাবে পড়াশোনার সহায়ক বানিয়ে ফেললাম। তোমরাও
এভাবে পড়াশোনার সাথে থাকো। নেভার স্টপ লার্নিং।

Editor - Shuvro Kagoj

আমরা সাহিত্য চর্চাও করবো না, লেখকও তৈরি করবো না, সম্পাদনাও করবো না, কেবল প্রকাশ করবো স্বপ্ন আর সৌহার্দ্য।

আপনার লেখা আজেই পাঠিয়ে দিন শুভ্র কাগজে। এই কাগজ প্রকাশ করবে আপনার প্রীতি।